বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০২:১০ পূর্বাহ্ন

ভুয়া মার্কিন ডাক্তারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য মুজিবুলের

নিজস্ব প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
  • ৫৭৫০ বার পঠিত
জালিয়াতির প্রমাণ মেলায় টেক্সাসে পড়েন নিষেধাজ্ঞায়

রসায়নের ছাত্র থেকে কথিত ‘ফাইভ স্টার’ প্রফেসর। ভুল চিকিৎসা আর মেয়াদহীন স্টেম সেল বাণিজ্যে উত্থান।  চটকদার বিজ্ঞাপন, ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহার এবং ‘অলৌকিক চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি’ এসবকে পুঁজি করে দেশে গড়ে উঠেছে এক বিতর্কিত চিকিৎসা সাম্রাজ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিজেকে আমেরিকান ডাক্তার ও ‘ফাইভ স্টার’ প্রফেসর পরিচয় দেওয়া কথিত চিকিৎসক ড. মুজিবুল হক। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তার ব্যবহৃত তথাকথিত ডাক্তার পরিচয়ের ভিত্তি কোনো স্বীকৃত মেডিকেল ডিগ্রি নয় বরং তা একটি বেসরকারি ওয়েলনেস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিলিং বিডি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে যাত্রা শুরু করেন মুজিবুল হক। শুরুতে ভেষজ ও কথিত অলৌকিক চিকিৎসার ভিডিও প্রচার করতেন। পরে ২০২১ সালে পেজটির নাম পরিবর্তন করে ‘প্রফেসর ড. মুজিবুল হক’ রাখা হয়। এরপর থেকেই তিনি নিজেকে ‘আমেরিকান বোর্ড সার্টিফায়েড ডাক্তার’, ‘ফাইভ স্টার প্রফেসর’ ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচার করতে থাকেন।

অনুসন্ধান বলছে, মুজিবুল হক কোনো স্বীকৃত মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস বা সমমানের চিকিৎসা ডিগ্রি অর্জন করেননি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি ওয়েলনেস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কোর্স করে দেশে ফিরে নিজেকে ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।

মুজিবুল হক যে সনদের ভিত্তিতে নিজেকে ‘ডাক্তার’ বলে প্রচার করেন, তা আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ন্যাশনাল ওয়েলনেস প্র্যাকটিশনার্স (AANWP) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ন্যাচারোপ্যাথি, হোলিস্টিক হেলথ, নিউট্রিশন ও ওয়েলনেস বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন দেয়। এটি কোনো সরকারি মেডিকেল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়।

ই-মেইলে যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেউ ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না এবং চিকিৎসাও করতে পারবেন না। এমনকি অ্যাপ্রন বা স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে উপস্থাপন করাও প্রতারণার শামিল। শুধু আগে থেকেই স্বীকৃত মেডিকেল ডিগ্রি ও লাইসেন্স থাকলে ব্যতিক্রম হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তাদের সার্টিফিকেশন শুধুমাত্র ওয়েলনেস প্রশিক্ষণের স্বীকৃতি। এটি রোগ নির্ণয়, চিকিৎসাপত্র দেওয়া বা অস্ত্রোপচার করার অনুমতি দেয় না। তাদের সনদ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বীকৃত মেডিকেল লাইসেন্সের সমতুল্যও নয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব তথ্য গোপন রেখে মুজিবুল হক দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘আমেরিকান ডাক্তার’ হিসেবে প্রচার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, বিজ্ঞাপন ও সেমিনারে তিনি এমনভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ তাকে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক বলে বিশ্বাস করেন।

সূত্র জানায়, তিনি ডাক্তারদের মতো অ্যাপ্রন পরে রোগী দেখলেও নিজের নামে কোনো প্রেসক্রিপশন প্যাড ব্যবহার করেন না। বরং তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিবন্ধিত চিকিৎসকদের প্যাড ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদনহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ স্টেম সেল থেরাপি দেওয়া হয়েছে। রোগীদের বলা হয়েছে, স্টেম সেল চিকিৎসায় শতভাগ রোগী সুস্থ হয়। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ রোগের ক্ষেত্রে স্টেম সেল থেরাপি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর ব্যবহার কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রায় দেড় শতাধিক রোগীর শরীরে স্টেম সেল প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিরাপদ উপাদান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, চিকিৎসার নামে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি, বরং অনেকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘অলৌকিক চিকিৎসা’, ‘ক্যান্সারের প্রতিকার’, ‘প্যারালাইসিস নিরাময়’, ‘প্রতিবন্ধী সন্তানের সুস্থতা’ এবং ‘ডায়াবেটিস নির্মূল’-এর মতো নানা দাবি করে রোগীদের আকৃষ্ট করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে এসব চিকিৎসাকে ‘ইসলামসম্মত’ ও ‘বিদেশি গবেষণায় প্রমাণিত’ বলে প্রচার করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মুজিবুল হকের প্রতিষ্ঠানে একদল ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসক কাজ করেন, যারা তার নির্ধারিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেন। তবে তাদের কয়েকজনের দাবি, জীবিকার কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলতে না পারলেও তারা এসব চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ স্টেম সেল ব্যবহারের সময় তাদের হাত কেঁপে ওঠে এবং তারা এ চিকিৎসাকে ভুয়া বলেও মনে করেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর টেক্সাস মেডিকেল বোর্ড তাকে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। আদেশে বলা হয়, তিনি টেক্সাসে নিজেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে বা সে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না।

টেক্সাস মেডিকেল বোর্ডের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মুজিবুল হক তার ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে বোর্ড-সার্টিফায়েড চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যদিও তিনি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসক নন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বোর্ড সার্টিফায়েড’, ‘আমেরিকান ডাক্তার’, ‘আন্তর্জাতিক প্রফেসর’ কিংবা ‘ন্যাচারাল হেলথ স্পেশালিস্ট’-এ ধরনের শব্দ দেখে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভুয়া চিকিৎসা ও বিকল্প চিকিৎসার আড়ালে প্রতারণার চক্র গড়ে উঠছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বীকৃত মেডিকেল ডিগ্রি ও সরকারি নিবন্ধন ছাড়া কেউ যদি নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রোগী দেখেন, তাহলে তা শুধু প্রতারণাই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। কারণ ভুল চিকিৎসা মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

তাদের মতে, দেশে ওয়েলনেস ও বিকল্প চিকিৎসার নামে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এসব ব্যবসার ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে যখনই গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কিংবা সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে, তখন সমালোচকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক, ব্লগার এবং সচেতন নাগরিক অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে, একজন রসায়নের শিক্ষার্থী থেকে ‘আমেরিকান ডাক্তার’ পরিচয়ে আলোচিত হয়ে ওঠা মুজিবুল হকের উত্থান এখন বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি বেসরকারি ওয়েলনেস প্রশিক্ষণ সনদকে ভিত্তি করে কীভাবে একজন ব্যক্তি নিজেকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন, কীভাবে অনুমোদনহীন চিকিৎসা দিয়ে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে গেলেন, আর কীভাবে এতদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে গেল এই কার্যক্রম- এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

এ বিষয়ে প্রথমে মুজিবুলের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি রোগী ভেবে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রতিবেদকের অবস্থান রাজধানী জানার পর ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি কথা বলতে গড়িমসি করেন। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় নিশ্চিত হবার পর তিনি তার জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন।

এ প্রসঙ্গে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের মিডিয়া পরামর্শক মাহিন এম ইউ মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ক্ষেপন করেন, অভিযোগকারীর পরিচয় জানতে চান। এমনকি মুজিবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ চান। এ সময় আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের প্রতারণার প্রমাণ দেওয়া হলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..