প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের প্রবাসে যাওয়ার প্রথম হাতিয়ার পাসপোর্ট। আর এই পাসপোর্ট করতে এসে নানা বিড়ম্বনা শিকার হন রেমিটেন্স যোদ্ধারা। পাসপোর্ট নাগরিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। অনলাইনে আবেদন, নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ এবং বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করার পর নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে এসে দালালের খপ্পরে পড়ে হয়রানি ও অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক সেবা প্রত্যাশী।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের আশপাশে সক্রিয় একটি দালালচক্র নতুন পাসপোর্ট, নবায়ন, তথ্য সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবার কথা বলে সাধারণ মানুষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। কেউ কেউ দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে । সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একাধিক দালাল গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড পাওয়ার পরও দালালদের তৎপরতা যেন বন্ধ হচ্ছে না । দালালরা আবার ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা সাদ্দাম হোসেনের অভিযোগ, নিজে নিয়ম মেনে পাসপোর্টের কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাঁচপুরের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, নিজে পাসপোর্ট আবেদন অনলাইনে জমা দিয়েছি চেয়েছিলাম সরাসরি নিজে বায়োমেট্রিক দিয়ে নিজের কাজটা নিজেই করে নিব। কিন্তু এখানে কর্মকর্তারা বিভিন্ন রুমে পাঠিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করছেন। দালাল দিয়ে কাজ করলে এত হয়রানি হতে হয় না।
বরপা এলাকার রাজমিস্ত্রী সামাদ মিয়ার বলেন, ছেলেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাহিরে পাঠাবো বলে পাসপোর্ট করতে এসেছিলাম। সকাল ছয়টা বাজে এই পাসপোর্ট অফিসে এসেছি এখন চারটা বাজে এখনো পাসপোর্ট অফিসের কাজ শেষ করতে পারিনি। এ পর্যন্ত চারটি রুম ঘুরে এলাম। আরেক রুম থেকে আরেক রুমে পাঠানো হয় । বিভিন্ন প্রক্রিয়া হয়রানির কারণে সাধারণ মানুষ সহজেই দালালদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালদের তৎপরতার অভিযোগের মধ্যে চলতি বছরের মে মাসে অভিযান চালানো হয়। ৭ মে নারায়ণগঞ্জের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে দালালচক্রের সাত সদস্যকে আটক করে র্যাব-১১ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানকারী দল। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক সাতজনের মধ্যে চারজনকে ১০ দিন এবং তিনজনকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রত্যেককে ২০০ টাকা করে জরিমানাও করা হয় ।
সেবা প্রত্যাশীদের দাবি আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি নতুন পাসপোর্টের জন্য এসেছেন, কার কাগজে ঘাটতি রয়েছে, কার আবেদন নিয়ে সমস্যা হয়েছে কিংবা কোন আবেদনকারী দ্রুত সেবা পেতে আগ্রহী—এসব তথ্য দালালরা কীভাবে জানতে পারছেন, এটা খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে কোনো সেবা প্রত্যাশীর আবেদন বা ফাইলের অভ্যন্তরীণ তথ্য কিভাবে অফিসের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায়, ধরনের অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে —এমনটি দাবি সেবা প্রত্যাশীদের।
পাসপোর্ট নিতে আসা মানিক মিয়া জানান পাসপোর্ট সেবা কোনো ব্যক্তির দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি আমাদের নাগরিকের অধিকার। সরকারের নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে আমরা দালালের সাহায্য ছাড়াই স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত ভাবে পাসপোর্ট সেবা পাব—এটাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সদ্য যোগদানকারী উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম দায়িত্ব নেওয়ার পর অফিসে ভোগান্তি বেড়েছে। বেড়েছে দালালদের তৎপরতাও।
ভুক্তভোগীদের দাবি দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু অভিযানের পরও যদি একই চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে শুধু দালাল আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দালালদের অফিসের সামনে অবস্থান ঠেকানো, সেবা প্রত্যাশীদের সরাসরি তথ্য দেওয়া, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা করা এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী দালালদের সহযোগিতা করছেন কি না—তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে ।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম বলেন, আমি আসার পর থেকে পাসপোর্ট অফিসকে গতিশীল করেছি। এখানে ফটোকপির করার ব্যবস্থা করেছি যাতে বাইরে ফটোকপি করতে বাইরে যেতে না হয়। এছাড়া আনসার সদস্যরা মাইকিং করে লাইনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমার এখানে কোন দালাল নেই।