“নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। উৎসবকে ঘিরে দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা, র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী নানা আয়োজন। পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের পৃথক উদ্যোগে পুরো এলাকা জুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এসময় বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন, রঙিন মুখোশ ও ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জায় অংশগ্রহণকারীরা বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন।
র্যালিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুল আলীম। শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ হাবিবুল্লাহ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অতীষ সরকার, উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আরিফুল ইসলাম, আইসিটি অফিসার ত্রিদীপ সরকার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার মোঃ শেফাইনুর আরেফিন, মোরেলগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ মাহমুদুর রহমানসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ফায়ার সার্ভিস, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
শোভাযাত্রা শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বক্তারা বাংলা নববর্ষের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে বাঙালির ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করার আহ্বান জানান। সাংস্কৃতিক পর্বে স্থানীয় শিল্পীরা লোকসংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
নববর্ষ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। মোরেলগঞ্জ সরকারি সিরাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী র্যালি, গ্রামীণ খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলা। কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ জাকির হোসেন জানান, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, মোরেলগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মোরেলগঞ্জ মডেল একাডেমিতেও শোভাযাত্রা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা বৈশাখী সাজে সেজে অংশ নেয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে।
উপজেলা পরিষদ চত্বরে বসানো বৈশাখী স্টলগুলোতে স্থান পায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ, পিঠা-পুলি, দেশীয় খাবার ও হস্তশিল্প। দিনব্যাপী চলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এছাড়া স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে কোথাও পান্তা-ইলিশ উৎসব, কোথাও গ্রামীণ মেলা ও লোকসংগীতের আসর বসে, যা উৎসবে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। এতে অংশ নেন স্থানীয় শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে যোগ দিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখেন।
উৎসবকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল সতর্ক অবস্থানে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে মোরেলগঞ্জ রূপ নেয় এক বর্ণিল, প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর জনপদে। নতুন বছরের প্রথম দিনটি আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ঐতিহ্য ও বাঙালিয়ানায় ভরপুর পরিবেশে উদযাপনের মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের মাঝে বয়ে আনে নতুন স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আশার বার্তা।