বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০২:১১ অপরাহ্ন

নৌ-খাতের প্রশিক্ষণ যন্ত্র বাণিজ্যের মাফিয়া সাব্বির মাদানি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৫৭৬৬ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত

দিনের আলোয় তিনি একজন সুশৃঙ্খল সরকারি কর্মকর্তা- নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার।  কিন্তু আড়ালে তার আরেকটি পরিচয় আছে। ঠিকাদারি জগতের কথিত ‘সিমুলেটর মাফিয়া’ ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ, ওরফে ‘সাব্বির মাদানি’।  পদ, পদবি ও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি সিমুলেটর খাতে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক বিশাল নেটওয়ার্ক।  নিজের শ্যালক এবং সাবেক এক মন্ত্রীর প্রভাবকে পুঁজি করে বিশ্বব্যাংকের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে তিনি যে অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন, তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি চাকরির আড়ালে গড়ে ওঠা এই ‘সিমুলেটর মাফিয়া’র শেকড় উপড়ে না ফেললে দেশের নৌ-প্রশিক্ষণ খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

টাইমস টুডের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, মেরিন একাডেমিতে প্রশিক্ষক থাকাকালীনই সাব্বির মাহমুদ আবাসন ব্যবসায় জড়ান।  শুরুতে ব্যর্থ হয়ে কয়েক কোটি টাকার দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েন।  তবে পরবর্তীতে নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রধান হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।  সিমুলেটর প্রকিউরমেন্টকে কেন্দ্র করে অল্প সময়েই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান।

আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবসা করার সুযোগ না থাকায় তিনি নিজের শ্যালক কাজী হাবিবুল হোসেনকে সামনে আনেন।  পেশায় সাধারণ ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন ব্যবসায়ী কাজী হাবিব হঠাৎ করেই ‘ইরেকটর্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে যান।  অভিযোগ রয়েছে, পর্দার আড়ালে থেকে সাব্বির নিজেই প্রতিষ্ঠানের ড্রাফট তৈরি, ব্যাংক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং ‘পরামর্শক’ পরিচয়ে নথিপত্রে স্বাক্ষর করতেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের ডিইপিটিসি (ডেক ইঞ্জিন পার্সোনেল ট্রেনিং সেন্টার) প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আহ্বান করা দরপত্রে (বিআরডব্লিউটিপি-জি৩সি) গুরুতর অনিয়ম ঘটে।  নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের স্পেসিফিকেশন তৈরির দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের হলেও, এখানে সংশ্লিষ্ট বিডার প্রতিষ্ঠান ‘এআরআই-ইরেকটর্স’ নিজেরাই স্পেসিফিকেশন তৈরি করে।  তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর সহযোগিতায় সাব্বির মাহমুদ এবং তার ভারতীয় অংশীদার অমিত ভট্টাচার্য এমনভাবে শর্ত তৈরি করেন, যাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে।  নরওয়ের ‘কনসবার্গ’-এর মতো প্রতিষ্ঠান আপত্তি জানালেও তা উপেক্ষা করা হয়। এমনকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ই-মেইলের উত্তরও সাব্বির নিজেই প্রস্তুত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত।

টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও দেখা যায় একাধিক অনিয়ম।  শুরুতে কোনো স্বাক্ষর বা সিলমোহর ছাড়াই দরপত্র জমা দেওয়া হলেও তা বাতিল করা হয়নি।  বরং মূল্যায়নের আগে গোপনে শতাধিক পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর করা হয়।  অভিযোগ আছে, তাড়াহুড়োর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে জাল স্বাক্ষরও ব্যবহার করা হয়েছে।  একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

এই অনিয়মের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কথাও উঠে এসেছে।  মেরিন একাডেমি ও এনএমআই-এর বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।   সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে।  বিশেষ করে সাবেক নৌ-মন্ত্রী শাহজাহান খানের প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলার সাহস পায়নি।

সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো প্রকল্প ‘মিস-প্রকিউরমেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা হতে পারে, যা দেশের ভাবমূর্তি ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অভিযোগের বিষয়ে সাব্বির মাহমুদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ এড়িয়ে যান।  পরে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি জানান, লিভারের জটিলতায় তিনি অসুস্থ ছিলেন।  এই বিষয়ের সাথে তিনি জড়িত নন।  প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান- ইরেকটর্স ও বিআইডব্লিউটিএ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।  প্রয়োজনে যোগাযোগের তথ্য দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন সাবেক এই কর্মকর্তা।  তবে টাইমস টুডের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..