শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১০ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
আদমদীঘিতে শুমারি স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগে ফলাফলে প্রশংসা, নির্বাচিতদের আ.লীগ ট্যাগে প্রচারণা মেধার স্বীকৃতি হিসেবে ৪২ মেধাবী শিক্ষার্থীকে ‘রাজকীয়’ সম্মাননা দিলো মোরেলগঞ্জ মডেল একাডেমি তাড়াইলের গজেন্দ্রপুর দালানবাড়ি মাদরাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ভিত্তিহীন: তদন্ত কমিটি আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব সাইফুল হাসানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ যশোরের বসুন্দিয়া ভূমি কর্মকর্তা পলাশের ‘হাদিয়া’র নামে ওপেন সিক্রেট ঘুষ বাণিজ্য: মাদ্রাসার জমি নামজারিতেও ৪০ হাজার টাকা ঘুষ! ধানমন্ডিতে ১২ বছরের গৃহকর্মী শিশু রিক্তার মৃত্যু: অভিযুক্ত পাউবো প্রকৌশলী সবিবুর রহমান দম্পতির ১৫ দিনে জামিন, নেপথ্যে টাকা নাকি চাপ? এলজিইডি নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানউজ্জামান দুলালের শত কোটি টাকার অনিয়ম ১৫বছরের চাকরি জীবনে ৯০ লাখ টাকা বেতন পেয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান গড়েছেন শতকোটি টাকার সম্পদ দুর্নীতির অভিযোগে দক্ষিণ সিটির আনিস, বোরহান চসিকের শাহীন, ফারজানা মুক্তা ৪ প্রকৌশলীর দেশ ত্যাগ ঠেকাতে নির্দেশ সাতক্ষীরা পৌর ভূমি অফিসের নায়েব ঘুষের ‘মহারাণী’ শর্মিষ্ঠা সরকারের মাসিক হাত খরচ লাখ টাকা

পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা পাচ্ছে না পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকরা

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৭৫৮ বার পঠিত

দেশের বীমা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা গ্রাহকদের বীমা দাবি সময়মতো পরিশোধ না করা। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের বীমা দাবি মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। এমনকি গ্রাহকদের ডিপোজিট পেনশন স্কিমের (ডিপিএস) মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও জমানো টাকা ফেরত না দেওয়ার দীর্ঘদিরে অভিযোগ রয়েছে এই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে।

শত শত ভুক্তভোগী গ্রাহক তাদের জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন পপুলার লাইফের বিভিন্ন অফিসে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। গ্রাহকরা বলছেন, টাকা রিফান্ড পাওয়ার দাবিতে কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোনো ফল পাইনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুধু আশ্বাসই মিলছে, কোনো টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। জমানো টাকা ফেরতের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছেন পপুলার লাইফের অনেক গ্রাহক।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার বেশি বীমা দাবি বকেয়া ছিল। বীমা খাতের জন্য এটি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছর বকেয়া দাবির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কোম্পানির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ৮৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম অর্জন করেছে। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল ৩৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ সময় অনুমোদিত সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ছিল ৪০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, আর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

কোম্পানিটির প্রথম প্রান্তিক শেষে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। একই সময়ে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫১৭ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এছাড়া ক্লোজিং লাইফ ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে কোম্পানির মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৭৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, অনিষ্পত্তিকৃত দাবির পরিমাণ রয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে পপুলার লাইফের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করলে তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত কোম্পানির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বি এম ইউসুফ আলীসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা এবং সম্পদ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

আর্থিক দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আদালত পপুলার লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বি এম ইউসুফ আলী, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) বি এম শওকত আলী ও মোস্তফা হেলাল কবির এবং জ্যেষ্ঠ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর ফিরোজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের একক আধিপত্য ও খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানটির তহবিল এবং সাধারণ বীমা গ্রাহকদের জমা দেওয়া প্রিমিয়ামের অর্থে ব্যাপক অনিয়ম ও নয়ছয় হয়েছে। এছাড়া, মেয়াদ পূর্তির পরও অনেক গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থ এবং বীমার সুবিধা নির্ধারিত সময়ে ফেরত পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পপুলার লাইফের এক গ্রাহক বলেন, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা পাচ্ছি না। জীবনের শেষ সময়ে কাজে দিবে এমন আশায় বীমা করেছিলাম কিন্তু তুলতে না পারায় চরম আর্থিক সংকটে আছি। বীমা প্রতি একদম আস্থা হারিয়ে ফেলেছি।

গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে পপুলার লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বি এম ইউসুফ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার ফোনে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, বীমা গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে আমরা সাতটি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছি। এসব কোম্পানির কাছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দাবি রয়েছে। এসব দাবি দ্রুত পরিশোধের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে, বিধিবদ্ধ সঞ্চয় ব্যতীত তাদের যেসব বিনিয়োগ ও সঞ্চয় রয়েছে, সেগুলো এনক্যাশ করে সেই অর্থ দিয়ে অবিলম্বে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি কোম্পানির মালিকানাধীন জমি ও ভবনের সম্পদের মূল্য দ্রুত নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থও দাবি পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, এছাড়া আগস্ট মাসের মধ্যেই কোম্পানিগুলোকে জানাতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তারা কত টাকা দাবি পরিশোধ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে তাদের যেসব সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রয়েছে কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শেয়ার ও বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে এনক্যাশ করে সেই অর্থও গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আইডিআরএ মুখপাত্র বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যেই সব কোম্পানিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনো কোম্পানি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রতিবেদক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিতে মতিঝিলের দিলকুশায় পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান কার্যালয়ে গেলে কর্তব্যরত গার্ড সাংবাদিক পরিচয় শুনে ঢুকতে দেয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গ্রাহকদের বৈধ বীমা দাবি পরিশোধ না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা শুধু বীমা কোম্পানিগুলোর নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি তাদের আইনগত বাধ্যবাধকতারও অংশ। তাই যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের দ্রুত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..