নারায়ণগঞ্জ জেলার আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিককরণ, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে দৃশ্যমান সাফল্যের কারণে প্রশংসিত নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সির বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হয়ে উঠেছে গোটা জেলা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক গেজেটে বদলির তথ্য প্রকাশের পরপরই শিক্ষক, আইনজীবী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ওসুশীল সমাজের সংগঠনের নেতারা একযোগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি ও অনুরোধ জানিয়েছেন—চলমান উদ্যোগগুলো পূর্ণ বাস্তবায়নের স্বার্থে দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তাকে নারায়ণগঞ্জেই বহাল রাখা হোক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক মাসে জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। এসপি মিজানুর রহমান মুন্সির সরাসরি নির্দেশনায় জেলার প্রবেশপথ, বাসস্ট্যান্ড, নদীবন্দর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এলাকায় চলেছে নিয়মিত চিরুনি অভিযান।
একই সঙ্গে—প্রতিটি ইউনিয়নে বিট পুলিশিং জোরদার।
স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা ও অভিভাবক-শিক্ষক মতবিনিময়।ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ।রাত-দিন টহল বৃদ্ধি, সিসিটিভি নজরদারি সম্প্রসারণ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট।
এসব উদ্যোগের ফলে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বলে দাবি করছেন নাগরিকরা। সন্ধ্যার পর শহরের রাস্তাঘাটে নারী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলেও স্বস্তি ফিরেছে।
পরিসংখ্যানেও মিলেছে তার প্রতিফলন। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন যার ফলে গত ছয় মাসে মাদক মামলা ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তারের হার বেড়েছে, এবং সাধারণ অভিযোগের সংখ্যা কমেছে। যানজট নিরসনেও তার সমন্বিত উদ্যোগের প্রশংসা করছেন শহরবাসী।
ধারাবাহিকতা ভাঙলে ক্ষতি হতে পারে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জ জেলাবাসি।একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, এত অল্প সময়ে তাকে সরিয়ে দিলে হাতে নেওয়া কাজগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নারায়ণগঞ্জকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়তে তাকে আরও কিছু সময় প্রয়োজন।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন,একজন নতুন এসপির জেলাকে বুঝতে, নেটওয়ার্ক গড়তে কয়েক মাস লেগে যায়। বর্তমান এসপির বড় পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীলতা দরকার। আমার বিশ্বাস জনকল্যাণমুখী বর্তমান সরকার বৃহৎ স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
সুশীল সমাজের নেতারা উদাহরণ টেনে বলেন, সম্প্রতি একজন এসপি এসে দুই-তিন মাসেই বদলি হয়েছেন। বছর না ঘুরতেই আবার ও বদলি। নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্প-বাণিজ্য নির্ভর স্পর্শকাতর জেলায় নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে অপরাধ দমন কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।
একজন রাজনৈতিক নেতার মন্তব্য,এসপি এসে কয়েক মাস থেকে চলে গেলে চলমান কার্যক্রম থেমে যায়। এতে উন্নতির বদলে বাধা তৈরি হয়। মিজানুর রহমান মুন্সিকে রাখলে হাতে নেওয়া কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব।
এসপি নিজেও মনে করেন, শুধু গ্রেপ্তার দিয়ে অপরাধের স্থায়ী সমাধান হয় না।জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে,এই ভাবনা থেকেই তিনি যুবসমাজকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটরিং, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে বিশেষ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনাও ছিল তার রোডম্যাপে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, স্কুল-কলেজের সামনে কিশোরদের আড্ডা ও উৎপাত কমেছে, মাদকের সহজলভ্যতাও আগের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অন্যতম শিল্প-বাণিজ্য কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে একজন দায়িত্ববান কর্মকর্তার নেতৃত্বে সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে তা সারাদেশের জন্য রোলমডেল হতে পারে।
দল-মত নির্বিশেষে জেলার পঞ্চায়েত কমিটি, শিক্ষক সমাজ, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর অভিমত—নারায়ণগঞ্জকে শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ার কাজটি মাঝপথে থেমে যাক, তা কেউ চান না।
এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জবাসীর সম্মিলিত অনুরোধ: জনকল্যাণের কথা বিবেচনা করে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সির বদলি আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে নারায়ণগঞ্জে বহাল রাখা হোক। তাহলেই হাতে নেওয়া উদ্যোগগুলো পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জেলাটি দেশের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার উদাহরণ হয়ে উঠবে।