পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ‘মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন দরগাহ্ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এ ভর করেছে অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির মহোৎসব।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার ২০ বছর ধরে জাল সনদে চাকরি ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে. কিন্তু এই অপরাধ ধামাচাপা দিতে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘দায়সারা’ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে. শুধু তাই নয়, এই দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের ভেতরেই অবরুদ্ধ হয়ে লোহার হাতুড়ির আক্রমণের শিকার হয়েছেন দুই সংবাদকর্মী. পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর সহায়তায় পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
দুই দশক ধরে জালিয়াতি: সনদের আদ্যোপান্ত:
অনুসন্ধানে ও বিদ্যালয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ছবি রানী খাসকেল নামের এক শিক্ষক বিদ্যালয়টিতে হিন্দু ধর্ম বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন. প্রথম এমপিওভুক্তির পর তিনি পর্যায়ক্রমে বি.এড স্কেল, টাইম স্কেল এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয় উচ্চতর স্কেলও বাগিয়ে নেন।
তবে অনুসন্ধানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে আস্ত সাপ। তার উচ্চতর স্কেল প্রাপ্তির জন্য ব্যবহৃত ‘বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা board’-এর অধীনে বাকাই হরি গোবিন্দ সংস্কৃত কলেজের আদ্য (১৯৯৬), মধ্য (১৯৯৭) এবং উপাধি (১৯৯৮) পরীক্ষার সনদগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে. এমনকি চাকরিতে যোগদানের পর আগামী ৫ বছরের মধ্যে তিনি এই সনদ অর্জন করবেন মর্মে যে রেজুলেশন দেখিয়েছেন, তাও সম্পূর্ণ ভুয়া। বিদ্যালয়ের তৎকালীন সাবেক শিক্ষক সাইদুর রহমান স্পষ্ট জানান ”উক্ত রেজুলেশনে আমরা কেউই স্বাক্ষর করিনি। যাদের সই আছে, তার সবটাই ভুয়া। ছবি রানী কীভাবে এটা তৈরি করেছেন তা আমাদের জানা নেই।”
দাপ্তরিক কোনো ছুটি না নিয়েই তিনি কীভাবে এই কোর্সগুলো সম্পন্ন করলেন, তারও কোনো প্রমাণ নেই. ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রবীন লাল রায় ছবি রানীর এই ভুয়া সনদগুলো EMIS সেলে আপলোড করে উচ্চতর স্কেলের ব্যবস্থা করে দেন।
শিক্ষা অফিসারের বিতর্কিত ভূমিকা ও ‘আর্থিক লেনদেন:
সনদ জালিয়াতির এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে একটি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় (স্মারক নং-উমাশিকা/মির্জা/পটুয়া/২০২৬/৩৮). কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের নামে চালানো হয়েছে চরম প্রহসন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে অভিযুক্ত শিক্ষক ছবি রানী খাসকেলকে বাঁচাতে মির্জাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে একটি একপেশে ও চতুর তদন্ত প্রতিবেদন জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠান. ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘অভিযোগকারী তার অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন’।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোনো ফৌজদারি বা বিভাগীয় অপরাধে অভিযোগ প্রত্যাহার করলেই কি একজন শিক্ষকের ‘জাল সনদ’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায়? জালিয়াতির সত্যতা যাচাই না করে কেবল অভিযোগ প্রত্যাহারের অজুহাতে অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া শিক্ষা অফিসারের সততাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই কাজে তাকে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহআলম (বিএসসি) ও মির্জাগঞ্জের একটি মাদ্রাসার সুপার, যিনি শিক্ষা অফিসারের সকল অপকর্মের সহযোগী বলে পরিচিত।
তথ্য সংগ্রহে গিয়ে অবরুদ্ধ সাংবাদিক: লোহার হাতুড়ি নিয়ে প্রাণনাশের চেষ্টা:
এই জালিয়াতি এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গত ০৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিদ্যালয়ে যান জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘The Country Today’-এর জেলা প্রতিনিধি মনজুর মোর্শেদ তুহিন এবং ‘বণিক বার্তা’ ও ‘এশিয়ান টেলিভিশন’-এর সাংবাদিক মোঃ বাদল হোসেন। প্রধান শিক্ষকের অনুমতিক্রমে সহকারী শিক্ষক কক্ষে ছবি রানী খাসকেলের বক্তব্য নেওয়ার সময় হঠাৎ চড়াও হন বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (দপ্তরি) জলিলুর রহমান গোলদার। তিনি সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন. পরবর্তীতে পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রধান শিক্ষক শাহআলম সাংবাদিকদের নিজের কক্ষে নিয়ে যান. কিন্তু সেখানেও আইসিটি শিক্ষক মোঃ সোহেল ও ইংরেজি শিক্ষক বিল্লাল হোসেন রাজুর মুঠোফোনের প্ররোচনায় জলিল গোলদার চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
একপর্যায়ে দুপুর ১:৩৫ ঘটিকায় শিক্ষিকা ছবি রানীর উপস্থিতিতে জলিল গোলদার স্কুলের বেল পেটানোর ভারী লোহার হাতুড়ি উঁচিয়ে সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন এবং ‘একদম মাইরা ফেলানু’ বলে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন, পরবর্তীতে মির্জাগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে সাংবাদিকদের নিরাপদে উদ্ধার করে আনে,এই ঘটনায় মির্জাগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৯১, তারিখ: ০৫/০৭/২০২৬) দায়ের করা হয়েছে।
কেঁচো খুঁড়তে সাপ: বেরিয়ে এলো আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য:
সাংবাদিকদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলার নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে বিদ্যালয়টির আরও দুটি ভয়াবহ অনিয়ম সামনে এসেছে, যা ফাইল 1000053599.” এবং “1000053600.”-এর অনুলিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
নাবালিকা বিয়ে ও শিক্ষক সোহেল:
বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক মোঃ সোহেলের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক (নাবালিকা) শিক্ষার্থীকে (স্থানীয় আবুল শরীফের মেয়ে রাবেয়া আক্তার) বিয়ে করে একসঙ্গে বসবাস করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
দপ্তরি জলিলের নিজের সনদই ভুয়া:
সাংবাদিকদের হাতুড়ি নিয়ে তাড়া করা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মোঃ জলিল গোলদার নিজেও অষ্টম শ্রেণির ভুয়া ও জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন! সংশ্লিষ্ট স্কুলের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই শিক্ষাবর্ষে জলিল গোলদার নামে কোনো শিক্ষার্থীর অস্তিত্বই ছিল না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
অভিযুক্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং কিসের ভিত্তিতে দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন জানতে চাইলে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
পটুয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মুজিবুর রহমানের বক্তব্য :
এমন কোনো দায়সারা তদন্তের অভিযোগ এখনো আমার দপ্তরে আসেনি। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, মির্জাগঞ্জ দরগাহ্ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন ”সনদ জালিয়াতি, তদন্ত নিয়ে কি হয়েছিল সেটা আমার জানা নেই, জেনে বলতে পারবো, তবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অবরুদ্ধের বিষয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছে সেটা থানা পুলিশ ব্যবস্থা নিবে, আর স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর লিখিত অভিযোগ হয়েছে সে বিষয়ে প্রধান শিক্ষক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন আমাকে দিবে আমি সে অনুযায়ী বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিবো।
একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে জাল সনদে চাকরি, নাবালিকা বিয়ে, কর্মচারীদের গুন্ডামি এবং তা ধামাচাপা দিতে শিক্ষা কর্মকর্তার এমন প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ওই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিকতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাছাড়া কিভাবে এমন দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তাকে মির্জাগঞ্জসহ আরো ৩টি উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হলো? প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষা সচেতন মহল।