ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (আসন ১১৩) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার নজরকাড়া। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন এবং বিএনপি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নূরের মধ্যে লড়াই, উপকূলীয় ঝুঁকি এবং দলভিত্তিক মতভেদ ভোটের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনো কোনো প্রার্থী এককভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।
এই আসনে রয়েছে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা, একটি পৌরসভা এবং ১৯টি ইউনিয়ন। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৭১। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ২০, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৮। মোট ভোটকেন্দ্র ১২৪টি, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
নদী ও চরবেষ্টিত এলাকা থাকার কারণে এই আসনের কিছু জায়গা ভোটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। গলাচিপার চরবিশ্বাস, চরখালী, বকুলবাড়িয়া এবং দশমিনার আলীপুরা, বাঁশবাড়িয়া, রণগোপালদী এলাকায় শীতকালীন কুয়াশা, নৌযান নির্ভর যোগাযোগ এবং দুর্বল ইন্টারনেট সমস্যা ভোট পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সময়মতো ভোট সামগ্রী পৌঁছানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াশা ও যাতায়াত সমস্যা ভোটার উপস্থিতি কমাতে পারে।
৫৩ বছর বয়সী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন দীর্ঘদিন বিএনপিতে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ৩০ ডিসেম্বর তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবুও তিনি গলাচিপা ও দশমিনার তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। মো. হাসান বলেন, যে প্রতীকই হোক, দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইবো এবং নির্বাচিত হলে জনতার পটুয়াখালী-৩ গড়ে তুলব।
৩১ বছর বয়সী নুরুল হক নূর গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে পরিচিতি পাওয়া নূর জোটের মনোনীত প্রার্থী। তিনি তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছেন। নুর বলেন, একক দলের ভোটে জনপ্রতিনিধি হওয়া সম্ভব নয়। আমি নির্বাচিত হলে সংসদীয় আসনকে এমনভাবে সাজাবো যা মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে।
নুর ৭ বছরে রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে ৩৫ বার আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২১ সালে তাকে ‘গণবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ায় হাসান মামুনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি সমর্থিত ভোটকে ভাগ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিভাজনের কারণে কোনো প্রার্থী সহজ জয় নিশ্চিত করতে পারছেন না। ভোটের দিন ভোটার উপস্থিতি এবং ভোট স্থানান্তর শেষ ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্রদল কর্মী বলেন, দীর্ঘদিন আমরা যারা হামলা ও মামলা শিকার, সেখানে হাসান আল মামুন ভাই আমাদের পাশে ছিলেন। তবে আমাদের দুঃখ, এই আসনে বিএনপি’র প্রতিক পেলাম না।
অটো চালক বশির মৃধা বলেন, কোন দলমত বুঝিনা, বহুদিন শান্তিতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাই নাই কিন্তু এবার ভোট দেব। যার কথার দাম আছে এবং গরিবদের নিয়ে ভাববে ভোট তাকেই দেব।
গলাচিপা বন্দর অঞ্চলের একটি পুরনো বাণিজ্যকেন্দ্র। চরাঞ্চলের কৃষক, জেলে ও মৎস্যজীবীদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির প্রধান কেন্দ্র এই বন্দর। নদীভিত্তিক যোগাযোগ, জীবিকার নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভোটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু করতে পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটেনিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ পাইনি তবে মুঠোফোনে কিছু অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করেছি। এ আসনের জন্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে এছাড়াও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত মনিটরিং করছে। দুর্গম ও চরাঞ্চলের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ সৈয়দুজজ্জামান বলেন, এ আসনের কোন প্রার্থী কিংবা সাধারণ জনগণ থেকে কোন ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর রয়েছে এবং নির্বাচনের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে যা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ হবে। দুর্গম অঞ্চলের ভোটার এবং ভোট কেন্দ্রের আইন শৃঙ্খলার প্রতি আমাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে।
এ পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। হেভিওয়েট প্রার্থী, উপকূলীয় ঝুঁকি এবং দলীয় বিভাজনের কারণে পটুয়াখালী-৩ আসনের নির্বাচন অনিশ্চিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোটব্যাংক বিভক্ত, মাঠের পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল; ফলাফল নির্ধারিত হবে ভোটের দিনই।