ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা হাজারো বাংলাদেশি যাত্রী এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এজন্য তারা সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় আটকা পড়েছেন। নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট না হওয়ায় আবাসন, খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব যাত্রী।
শনিবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ফেরার কথা ছিল ওমরাহ যাত্রীদের। কিন্তু ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যাওয়ায় তারা পড়েছেন বিপাকে। হোটেল থেকে চেক আউট করে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা অনেকের। নতুন করে কক্ষ পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সৌদি এয়ারলাইনসের যাত্রীদেরও।
শনিবার সকালে ইরানে হামলার পরপরই ইসরায়েল তাদের আকাশসীমায় সব বেসামরিক বিমানের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। পরে একে একে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই পথে হাঁটে। বাহরাইন, দুবাই ও কাতারসহ একাধিক দেশের আকাশপথে বিধিনিষেধ জারি হওয়ায় ঢাকা থেকেও এসব গন্তব্যে সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ইউএস-বাংলার যে ফ্লাইটটি আজ ঢাকা থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল, সেটি যেতে পারেনি। আর সেটিই ফিরিয়ে আনার কথা ছিল আটকা পড়া যাত্রীদের।
মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানরত এসব যাত্রীর অনেকেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হোটেল ছেড়ে দিয়েছেন। ফ্লাইট স্থগিত হওয়ার খবর পেয়ে হোটেলে ফিরে গিয়েও নতুন কক্ষ না পাওয়ার হাহাকার। অনেকে হোটেল লবি, করিডর এমনকি খোলা জায়গায় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন। খাবারের সংকটও দেখা দিয়েছে।
নগদ টাকা শেষ হয়ে আসছে, আবার স্থানীয় কারেন্সি না থাকায় বিপাকে পড়েছেন অনেকে। ওমরাহযাত্রী মো. জাকির হোসেন জানান, আমাদের ফ্লাইট ছিল। হোটেল ছেড়ে দিয়েছি। এখন ফ্লাইট কবে হবে কেউ কিছু বলতে পারছে না। হোটেলে ফিরতে চাইলেও রুম নেই। শিশু ও বৃদ্ধসহ আমরা প্রায় ৩০ জন এখানে আটকা। খাবারও শেষ।
আরেক যাত্রী নুরজাহান বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বয়স্ক বাবা-মাকে নিয়ে এসেছিলাম। তাদের ওষুধ ফুরিয়ে এসেছে। দেশে ফিরে যেতে পারছি না। কী হবে আমাদের?
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকে যাত্রীদের ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের তথ্য এসএমএস, ই-মেইল ও কল সেন্টারের মাধ্যমে আগাম জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থেকে যাত্রীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে সৌদিতে আটকা পড়া যাত্রীরা বলছেন, সেখানকার এয়ারলাইনস প্রতিনিধিরা সেভাবে সহায়তা করছেন না। যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে যাত্রীদের ১৩৬৩৬ নম্বরে যোগাযোগ করে সর্বশেষ ফ্লাইট পরিস্থিতি জেনে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রোববার দাম্মাম, জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, শারজাহ, আবুধাবি, কুয়েত ও দুবাইগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া বিমানবন্দরে না আসার অনুরোধ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্যান্য যাত্রীদেরও নিজ নিজ এয়ারলাইনস বা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এমন সংটকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আটকা পড়া যাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। স্থানীয় হোটেল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, জরুরি ভিসা বাড়ানো এবং খাবারের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে দূতাবাসের তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত যাত্রী নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কবে থামবে, আকাশসীমা কবে খুলবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যে সৌদি আরবেও যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ কতদিন বাড়বে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।