পটুয়াখালীর সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মোঃ জহিরুল ইসলাম মামুনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ জালিয়াতি ও ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। কলেজের শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা আফজাল হোসেনের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কলেজে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন জহিরুল ইসলাম মামুন। অভিযোগ রয়েছে, মামুনের ছোট ভাই একসময় আফজাল হোসেনের বাসায় কাজ করতেন। সেই সূত্র ধরে তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে কলেজে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।
কলেজের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কলেজের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতেন। ভর্তি ফরম ফিলাম, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও প্রশাসনিক নানা কাজে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার আচরণে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ক্ষোভ বিরাজ করছে বলেও জানা গেছে।
প্রশিক্ষণের আড়ালে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ নিয়ে তোলপাড়:
জহিরুল ইসলাম মামুনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কলেজজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় ৪৫ দিনের একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গিয়ে তার এক সহকর্মীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে যা সহকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা ছিল।
“সমিতির নামে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ”: স্থানীয়দের অভিযোগ:
মামুনের নিজ এলাকায়ও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় এক ব্যক্তি, যিনি “জহির চাচা” নামে পরিচিত, তিনি বলেন, “মামুন সমিতি করার কথা বলে এলাকার অসহায় ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে সেই টাকার কোনো হিসাব দেয়নি। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করে অনেকের টাকা আত্মসাৎ করেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় কেউ প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেত না।
নিয়োগেও মিলেছে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ:
শুধু ব্যক্তিগত ও আর্থিক অভিযোগই নয়, জহিরুল ইসলাম মামুনের চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
গতো ২৪ ডি ২০২৫ ও ২৫ ডি: ২০২৫ খ্রিঃ শিক্ষা মন্ত্রনালয় পরিদর্শন ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর হতে মাহামুদুল হাসান মোহসম্মাদ মনিরুল ইসলাম এবং চন্দন কুমার দেব এর এক অডিট রিপোর্টের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মোঃ জহিরুল হক (ইনডেক্স-৩০৮১৮৪১) ২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে কলেজে চাকরিতে যোগদান করেন। নিয়োগ রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং একই বছরের ৫ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু গভর্নিং বডির ৩০ আগস্ট ২০০৯ সালের সভায় নিয়োগ কমিটির সভাপতি হিসেবে গভর্নিং বডির সভাপতি মোঃ শাহজাহান মিয়াকে দায়িত্ব দেয়া হলেও নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন শীটে তার কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।
বরং নিয়োগ কমিটির রেজুলেশনে উল্লেখ করা হয়, সভাপতির মনোনীত প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ শিক্ষা বিধিমালায় সভাপতির পরিবর্তে প্রতিনিধির সভাপতিত্বে নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার কোনো বিধান নেই।
এতে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার নিয়োগ “বিধি সম্মত হয়নি”। যার স্মারক নং-৩৭.১৯.০০০০.০০০.০৬৫.১৬.০০৬.২৬.৬, তারিখ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ইং।
৩০ লাখ টাকার বেশি ফেরতের সুপারিশ:
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়োগ বৈধ না হওয়ায় তিনি সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন।
১ নভেম্বর ২০১০ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত এমপিও খাত থেকে উত্তোলিত প্রায় ৩০ লাখ ৮ হাজার ২০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ মার্চ ২০২৪ থেকে সরকারি করণের পর রাজস্ব খাত থেকে উত্তোলিত বেতন-ভাতাও বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জহিরুল ইসলাম মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার নিয়োগ বিধি সম্মত হয় নাই বা কি হইছে তার তো আমি জবাব দিতে পারছিনা, আমাকে তো কতৃপক্ষ নিয়োগ দিয়েছে। আর অন্য কোন বিষয় নিয়ে যদি নিউজ করেন সেটা ভিক্টিম মানহানি মামলা করবে বা যা কিছু হোক করবে।
তবে কলেজ সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের আরও অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সামনে আসতে পারে।