বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৭ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
বেতাগীর আলোচিত শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও মারধরের ঘটনার প্রধান আসামিসহ আটক ৩ জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পিবিআই কর্মকর্তা মনজুর রহমান পিপিএম পদকে ভূষিত নান্দাইলে জুয়া, মাদক কারবারী ও সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে- ইয়াসের খান চৌধুরী নান্দাইলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি: স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে লিফলেট বিতরণ করলেন প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি মোরেলগঞ্জের বহরবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা সরবরাহের বিল উত্তোলন: সান্তাহারে ইছামতির নামে ২০০ টন চাল, সরবরাহ করছেন স্বপন! হরিরামপুরে সোলার নেট মিটারিং ও সার্ভিস প্রোভাইডারদের নিয়ে মতবিনিময় মোরেলগঞ্জে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, আহত ১৫ নিউইয়র্কে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমন ঘিরে নেতাকর্মীদের উল্লাস

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট: ৫ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্যে দীর্ঘশ্বাস

নিজস্ব প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
  • ৫৮১৫ বার পঠিত

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আজ নিজেই যেন ‘অকল্যাণের’ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। হাজার কোটি টাকার সম্পদ, হাসপাতাল, কারখানা ও মূল্যবান জমি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর বড় অংশ পড়ে আছে অব্যবস্থাপনা, দখল আর অনিয়মের কবলে। অভিযোগ উঠেছে, ট্রাস্টের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানের নীরব ভূমিকা ও কার্যকর সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে বছরের পর বছর ধরে বেহাত হচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাখা রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

অভিযোগ রয়েছে, এই ট্রাস্টের আইনি জটিলতার ভুয়া দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে, অডিট রিপোর্টে দুর্নীতির প্রমাণ থাকার পরও মো. মাহবুবুর রহমান নিশ্চুপ থাকছেন এবং অবৈধ দখলদারদের নির্বিঘ্নে লুটপাটের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

ট্রাস্টের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধারা- এ প্রসঙ্গে সবার বক্তব্য একটাই, বর্তমান এমডি দৃশ্যত এই মহালুটপাটের নীরব প্রশ্রয়দাতা ও রক্ষক; যার রহস্যজনক আশীর্বাদেই বীরদের সম্পত্তি আজ বেহাত।

মিরপুরে সরেজমিনে গেলে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা শুধু বেদনার নয়, চরম লজ্জারও। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা বয়সের ভারে ন্যুব্জ, অসুস্থ ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার জন্য ১৯৯১ সালে তৈরি হয়েছিল ১০০ শয্যার ‘ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতাল’। যে হাসপাতালটি হওয়ার কথা ছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শেষ বয়সের নিরাপদ আশ্রয়, সেটি গত ৩০ বছর ধরে ভূতুড়ে বাড়ির মতো পরিত্যক্ত।

কোটি কোটি টাকার দামি চিকিৎসাসামগ্রী অনেক আগেই লুট হয়ে গেছে। যে কেবিনগুলোতে শুয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সুচিকিৎসা পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন বাইরের মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। আর হাসপাতালের পুরো চত্বর দখল করে বীরদর্পে চলছে স্থানীয় মেকানিকদের গ্যারেজ। যেখানে শোনার কথা ছিল চিকিৎসকের অভয়বাণী, সেখানে দিনভর চলে হাতুড়িপেটার শব্দ। জাতীয় বীরদের জন্য নির্মিত হাসপাতালটি আজ স্রেফ একটি গাড়ির গ্যারেজে পরিণত হয়েছে।

এদিকে তেজগাঁও শিল্প এলাকার গল্পটি আরও বেশি কষ্টের, আরও বেশি আক্ষেপের। আমাদের শৈশবের আবেগের নাম ‘মিমি চকলেট’ ও ‘তাবানি বেভারেজ’। এগুলো শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই ছিল না, ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং অর্থনৈতিক গৌরবের প্রতীক। সেই কারখানাগুলো আজ স্রেফ ইতিহাস। ভেতরের দামি যন্ত্রপাতিগুলো কোথায়, কার পকেটে গেছে- তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। সাড়ে ৪ একর অতি মূল্যবান জমি লিজের নামে তুলে দেওয়া হয়েছে তৃতীয় পক্ষের হাতে। মিরপুরে তাবানী বেভারেজের সামনে এখন ঝুলছে ‘টিভিএস’ মোটরসাইকেলের বিশাল সাইনবোর্ড।

কাগজপত্র বলছে, ২০১৮ সালে তারা জায়গাটি লিজ নেয় এবং ২০২২ সালেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। অথচ এখনও এই স্বর্ণমূল্যের জমি তাদেরই দখলে।

লুটপাটের এই উৎসব শুধু মিরপুর বা তেজগাঁওয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে গুলিস্তান ও নাজ সিনেমা হল ভেঙে বহুতল ভবন করা হলেও, দোকান বরাদ্দ বা পজেশন বিক্রির কোটি কোটি টাকা ট্রাস্টের তহবিলে কতটুকু জমা পড়েছে, তা কেউ জানে না। কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কিংবা হাটখোলার হারদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি-সবই এখন রাজনৈতিক দালাল ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের শক্ত কব্জায়।

ঢাকার বাইরেও চলছে একই মহোৎসব। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে ৪ একর জমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার নামে লিজ নিয়ে প্রভাবশালীরা গুদামঘর বানিয়ে চড়া দামে পজিশন বাণিজ্য করছে। টঙ্গীর বাক্স রাবার, চট্টগ্রামের জুস প্ল্যান্ট এবং নারায়ণগঞ্জের করিমুল্লাহবাগের ৭ একর জমিও অলস পড়ে আছে। ট্রাস্টের একমাত্র সচল প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশন’-এও চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। সব মিলিয়ে প্রতি বছর সরকার হারাচ্ছে শত কোটি টাকার রাজস্ব, আর মুক্তিযোদ্ধারা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে।

এই মহালুটপাটের বিষয়ে জানতে এমডি মাহবুবুর রহমানের দপ্তরে গেলে তিনি কোনো কথা না বলেই এড়িয়ে যান। বারবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও খুদে বার্তা দেখেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ট্রাস্টের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবেই এই ধ্বংসযজ্ঞ দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। একটি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা হয়েও তিনি কোনো সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না; বরং কেবল সাধারণ রুটিন ফাইল চালাচালি করে দিন পার করছেন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্পদ নিয়ে প্রশাসনের এমন উদাসীনতা ও অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলেও জানান ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..