শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীনের ১৭টি চুক্তি-সমঝোতা স্মারক সই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ লালকার্ডের রেকর্ড ব্রাজিলের দখলের চীনের করিডোর প্রস্তাবকে ইতিবাচক দেখছে সরকার: মাহাদী আমিন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হোসেনি দালান থেকে শুরু তাজিয়া মিছিল ডিভোর্সের পর দীর্ঘ অনুপস্থিতি, সাবেক স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে সক্রিয়—মিরা খানকে ঘিরে বিতর্ক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল চীনের সঙ্গে ২ চুক্তিসহ ১৩ সমঝোতা স্মারক সই বামনার মেয়ে মঠবাড়িয়ার স্ত্রী, স্বামী শশুর শাশুড়ির নির্যাতনে গৃহবধূ বিচার চেয়ে কাঠালিয়া প্রেস ক্লাবে

১৭৮৮ জন তরুণ দক্ষ শিক্ষানবিশের তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে পিকেএসএফ

আসাদুজ্জামান সজীব:
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬
  • ৫৭৬০ বার পঠিত

দেশের অর্থনীতিতে তরুণদের উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের একটি কার্যকর ব্যবসায়িক ও সামাজিক মডেল পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত Recovery and Advancement of Informal Sector Employment (RAISE) প্রকল্প। 

বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম এবং এক- তৃতীয়াংশ তরুণ। তবে বিপুল এই যুবশক্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসম্মত কর্মসংস্থান ও চাহিদামাফিক দক্ষতার অভাব।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু বাজার চাহিদার সাথে দক্ষতার অমিল এবং পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাবে এই তরুণদের একটি বড় অংশই NEET – Not in Education, Employment, or Training অর্থাৎ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণহীন নিষ্ক্রিয় শ্রেণীতে পরিণত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা দেশের জন্য উল্টো বোঝায় পরিণত হতে পারে।

পুঁথিগত শিক্ষা ও প্রচলিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সাথে বাস্তব শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে তীব্র অমিল রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে।

বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫%-এর বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এর মধ্যে ঝরে পড়া তরুণ এবং পিছিয়ে পড়া নারীদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত কারিগরি ও জীবন দক্ষতার অভাবে স্থায়ী কর্মসংস্থানে পৌঁছাতে পারছে না।

নিম্ন আয়ের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের বাস্তবমুখী সমাধান: RAISE প্রকল্পের Apprenticeship Model

পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘Recovery and Advancement of Informal Sector Employment (RAISE)’ প্রকল্প কোনো কৃত্রিম ক্লাসরুম বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ভর নয়। এটি সম্পূর্ণ বাজার-চাহিদাভিত্তিক এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষানবিশ মডেল।

বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ মাস্টার ক্রাফটস্পারসন বা ওস্তাদ-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে হাতে-কলমে কাজ শেখে শিক্ষানবিশরা। ফলে প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন একযোগে চলে এবং স্কিল মিসম্যাচ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

৬ মাস মেয়াদী এই প্রশিক্ষণে জাতীয় যোগ্যতা মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, লগবুকের মাধ্যমে দৈনিক পর্যবেক্ষণ এবং শেষ পর্বে নিরপেক্ষ বহিঃস্থ চূড়ান্ত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়, যা প্রশিক্ষণার্থীর শতভাগ কর্ম-প্রস্তুতি নিশ্চিত করে।

গুণগত মান নিশ্চিতকরণ অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল

ন্যূনতম ৫ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষাদানের মানসিকতা – এই তিন মানদণ্ডে ওস্তাদ নির্বাচন করা হয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে নারী শিক্ষানবিশদের জন্য ‘নারী ওস্তাদ’ নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ চলাকালীন ওস্তাদদের মাসিক ১,৫০০ টাকা সম্মানি ও সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, শিক্ষানবিশদের ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিন দফায় মোট ২১,০০০ টাকা স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়।

কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ৪০ ঘণ্টার বিশেষ মডিউলে যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য মোকাবিলার মতো আচরণগত দক্ষতা শেখানো হয়।

টেকসই রূপান্তর: Tracer Study সাফল্যের পরিসংখ্যান

পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ ‘Tracer Study on the RAISE Apprentices’ জরিপের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পভুক্ত শিক্ষানবিশদের ৮৮% প্রশিক্ষণ সমাপ্তির স্বল্পতম সময়ে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পেরেছে।

এর মধ্যে ৬৪% মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে এবং ২৪% আত্মকর্মসংস্থানে (উদ্যোক্তা হিসেবে) নিয়োজিত হয়েছে।

চাকরি মেলা ২০২৬: নিয়োগকর্তা দক্ষ জনবলের তাৎক্ষণিক সেতুবন্ধন

দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে সরাসরি শ্রমবাজারের সাথে সংযুক্ত করতে দেশব্যাপী পিকেএসএফ-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে মোট ৯১টি চাকরি মেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ২৩টি সফলভাবে সম্পন্ন।

বাস্তব ফলাফল (পরিসংখ্যান):

মেলায় চাকরি-প্রত্যাশী অংশগ্রহণকারী: ৪,৮০৮ জন, জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে: ৩,৪০০টিরও বেশি, তাৎক্ষণিক চাকরি লাভ: ১,৭৮৮ জন ও চাকরিপ্রাপ্ত নারী শিক্ষানবিশ: ৫৮৭ জন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ৪১টি আনুষ্ঠানিক এবং ১৫৬টি অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান এই মেলায় অংশ নিয়েছে।

স্যামসাং, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার ফুডস, ওয়ালটন, ট্রান্সকম, প্রাণ-আরএফএল, সিঙ্গার, কিয়াম, ইয়াংওয়ান, সুজুকি মটরস, কারুপণ্য, নাবিল গ্রুপ, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, বিডিজবস, সিম্ফনি, মেটাডোর, আনোয়ার গ্রুপ এবং নগদ এদের মধ্যে অন্যতম।

প্রথম সারির কর্পোরেট খাতের মূল্যায়ন অভিমত

স্যামসাং ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ:

RAISE প্রকল্পের চাকরি মেলাকে দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের সাথে যোগাযোগের একটি চমৎকার মাধ্যম হিসেবে দেখছে স্যামসাং ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ৬ মাসের প্রশিক্ষণ চলাকালীন শিক্ষানবিশদের অর্জিত জীবন দক্ষতা ও ইতিবাচক মনোভাব কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, যা আগামীতেও তাদের এমন অর্থপূর্ণ উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহী করছে।

বিডিজবস ডটকম:

তরুণদের কর্মসংস্থানে RAISE প্রকল্পের চাকরি মেলাকে দক্ষ মানবসম্পদ ও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সময়োপযোগী সেতুবন্ধন তৈরি করেছে বলে মনে করছে বিডিজবস ডটকম। মেলায় চাকরিপ্রার্থীদের গভীর আগ্রহ ও পারদর্শিতা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে তরুণদের পেশাগত দিকনির্দেশনা দিতে ‘ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং’ সেবা প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড:

RAISE প্রকল্পের এই উদ্যোগকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ জনবল হিসেবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দূরদর্শী বলে মনে করছে স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড। মেলায় বর্তমান শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী অনেক সম্ভাবনাময় প্রার্থীর সন্ধান মেলায় ভবিষ্যতেও এমন কর্মসংস্থানমুখী আয়োজনে অংশীদার হিসেবে থাকার প্রত্যয় জানিয়েছে তারা।

চ্যালেঞ্জ ও নীতিনির্ধারণী ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

তরুণদের ক্রমাগত কর্মপরিবর্তন একটা চ্যালেঞ্জ: অনানুষ্ঠানিক খাতের তরুণদের মধ্যে ঘন ঘন কর্মপরিবর্তন বা কাজের জায়গা বদলানোর প্রবণতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার কারণে কর্মসংস্থানের ডাটাবেজ দ্রুত পুরনো হয়ে যায়।

প্রস্তাবিত সমাধান:

ভবিষ্যতে একটি জাতীয় অনলাইন কর্মসংস্থান ব্যুরো বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেখানে নিয়োগদাতা ও কর্মজীবী উভয়ই নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করবেন এবং বিনিময়ে ছোটখাটো ডিজিটাল প্রণোদনা, যেমন – মোবাইল রিচার্জ বা নগদ সুবিধা পাবেন। এটি দেশের সামষ্টিক শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বুঝতে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা করবে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) সম্পর্কে

কর্মসৃজনের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত কয়েক দশকে দেশের শীর্ষ উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিকেএসএফ নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। টেকসই অর্থায়ন, উদ্যোগ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষমতায়নে অনুঘটক হিসেবে অব্যাহতভাবে কাজ করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে। নিরন্তর উদ্ভাবন, বাজার শক্তিশালীকরণ এবং নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে মানুষের সক্ষমতা সৃষ্টিই পিকেএসএফ-এর মূল লক্ষ্য। পিকেএসএফ একটি ‘প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে গত কয়েক দশকে দেশজুড়ে দুই শতাধিক ক্ষুদ্র অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সামগ্রিকভাবে ক্ষুদ্রঋণ খাতের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। শোভন কর্মসংস্থান, ঝুঁকি নিরসন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি—এ তিন মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পিকেএসএফ বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, ঘাতসহিষ্ণু ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..