তিনি পার্সেন্টেজ খান না। ঘুষ নেন না! টাকা ছুঁয়েও দেখেন না। ইনি হচ্ছেন মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম। তিনি আপাদমস্তক একজন ভণ্ড হিসাবে গণপূর্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে পরিচিত। তবে ঠিকাদাররা ওয়ার্কঅর্ডার নিয়ে সাইডে গেলে অধিনস্থ দুজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) বলে থাকেন কাজ হয়ে গেছে, আপনি হিসাব করে টাকা দিয়ে যান। বিল সময় মতো পেয়ে যাবেন। ওই হিসাবের মারপ্যাচে ফেলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে চুক্তিমূল্যের ৩৭% থেকে শুরু করে ৬০% ক্ষেত্রবিশেষ এর চেয়েও বেশী টাকা আদায় করছেন সংশ্লিষ্ট এসডিই ও সেকশন অফিসাররা। ঠিকাদার সেজে যাওয়া আমাদের প্রতিনিধির কাছে দুই এসডিই ওই হিসাবে টাকা চেয়েছেন। এর মধ্যে ৫% নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল পাবেন বলেও এসডিইদ্বয় নিশ্চিত করেন।
মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের মাঠ পর্যায়ে গত দুই মাসে সরেজমিন অনুসন্ধানে এই ধরণের ভণ্ডামির মাধ্যমে লুটপাটের তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী অসংখ্য সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগে জানা যায়, প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম বলে থাকেন টেন্ডার কাজ বা বিলের চেক প্রদানে তাকে কোন টাকা দিতে হবে না। কিন্তু বাস্তব অবস্থা পুরোপুরি উল্টো। কার্যাদেশ নেওয়া থেকে শুরু করে চেক গ্রহণ পর্যন্ত কাজের প্রতিটি স্তরেই নির্দিষ্ট হারে পার্সেন্টেজ দিতে হয় ঠিকাদারকে। এডিপি স্বাস্থ্য সেবা স্বাস্থ্য শিক্ষা বা বিশেষ বরাদ্দের যে কোন ক্ষেত্রে ঠিকাদার ওয়ার্কঅর্ডার নিয়ে সাইটে গেলে কাজ করতে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী। তিনি বলে থাকেন কাজ আগেই হয়েছে। ক্যালকুলেটর টিপে হিসাব করে কখনো চুক্তিমূল্যের ৬০% বা এর চেয়েও বেশী টাকা আদায় করেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে। এ টাকা সেকশন কর্মকর্তা (উপসহকারী প্রকৌশলী), এসডিই ও নির্বাহী প্রকৌশলীর মধ্যে নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ-বাটোয়ারার পরেই বিলে স্বাক্ষর করেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় ঠিকাদারকে বিভিন্ন অজুহাতে নাট্যী ঘোড়ার মতো ঘুরতে হয় টেবিল টু টেবিলে। এ যেন ভাদের দেশে এক সাধু সন্নাসী বাস করছেন প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম। তাকে ‘ডিজিটাল ভণ্ড’ হিসাবে উপাধি দিয়েছেন সহকর্মী প্রকৌশলী ও গণপূর্ত ঠিকাদাররা।
আরও জানা যায় গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ডিভিশনটিতে এডিপি (বার্ষিক কেলকাট) খাতে আবাসিক্যের ১২০টি কাজে ৫ কোটি ২০ লক্ষ টাকা, অনাবাসিক্যের ১০৫টি কাজে ৫ কোটি ৫০ লক্ষ টাকাসহ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২২টি কাজের নামে ৫ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে ১৪টি কাজের নামে ২ কোটি ১৩ লক্ষ টাকাসহ প্রায় ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ উঠেছে এই বরাদ্দের টাকা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের সাথে আঁতাত করে বিল পরিশোধ করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ তরিকুল ইসলাম। চলমান ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এডিপি ও স্বাস্থ্যসেবা/স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতের কাজগুলো নিয়েও অধিনস্থদের যোগসাজশে লুটপাটের আশ্রয় নিয়েছেন। সাধারণ ঠিকাদাররা তাকে অফিসে না পেয়ে প্রয়োজনীয় সেবা ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের সাথে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ জোন বিল্ডিং ও সার্কেল অফিসে বসে দেখা করে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করছেন। সকাল ১০ টা পর্যন্ত অফিসে থাকার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকেও তিনি থোড়াই কেয়ার করছেন। চলতি সপ্তাহে গত তিনদিন সকাল সাড়ে ৯টায় তার অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি। ফোন দিলে তিনি বলছেন সাইটে আছেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মেরামতের অভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক কান গলা (ইএনটি) বিভাগের ৩০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছাদের একংশের পলেস্তারা খসে পড়ে এক রোগী আহত হয়। মেরামতের রক্ষণাবেক্ষণের নামে এক অর্থবছরে এত টাকা খরচের পরেও কিভাবে পলেস্তারা ভেঙ্গে পড়ে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। ছাদ ও দেয়াল থেকে বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে পড়ার কারণে এভাবে বছরের বিভিন্ন সময়ে আহত হচ্ছেন রোগী ও মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীরা।।
এদিকে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ পেয়েছেন ৫ কোটি ২ লাখ ৯৭হাজার টাকা। এই বরাদ্দে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের নিচতলায় ট্রায়াজ রুম ক্যাজুয়ালটি ডাক্তার রুম টয়লেট তৈরী করণসহ পুনঃবিন্যাসের নামে ৪০ লাখ, একই হাসপাতালের মূল ভবনের ৩য় তলার কেবিনের টয়লেটের কমোড সানিটারী ফিটিংস ও ভাংগা দরজা জানালা নবায়ন ও রং করাসহ আনুসাঙ্গিক মেরামতের জন্য ৪০ লাখ, একই হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে নতুন টয়লেট জোন ও রোগীদের জন্য অপেক্ষাগার নির্মাণের নামে ২০ লাখ, একই হাসপাতালের পুরাতন জরাজীর্ণ গ্যাসলাইন সমূহ পরিবর্তনসহ আনুসাঙ্গিক মেরামতের জন্য ২০ লাখ, একই হাসপাতালের আওতাধীন ৩২৪, এলিফ্যান্ট রোডের স্টাফ কোয়াটারের ৩ ও ৯নং ভবন মেরামতের জন্য ৩৬ লাখ, একই হাসপাতালের আওতাধীন ২০৮, লালবাগপিলখানা স্টাফ কোয়াটারের নিরাপত্তা দেয়াল মেরামতের নামে ৩০ লাখ, একই হাসপাতাল-২ এর কেবিনে পানি পড়া বন্ধ করণের নিমিত্তে ওয়াটার প্রুফিং এর নামে ২০ লাখ, হাসপাতালের আওতাধীন ইন্টার্ন ছাত্র হোস্টেলের বাথরুম ও অন্যান্য সংস্কারসহ আনুসাঙ্গিক মেরামতের বিপরীতে ৪০ লাখ, একই হাসপাতাল-২ এর নিচতলা হতে ১০ম তলা পর্যন্ত সিড়ি ঘরসমূহের রাজমিস্ত্রি পরিবর্তন ও রং করাসহ আনুসাঙ্গিক মেরামতের জন্য ২০ লাখ, একই হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের ওয়ার্ড নং-২১৭ এবং ২২৮ এর ডাক্তার এবং রোগীর টয়লেটসমূহের মেরামত ও সংস্কারে ১৫ লাখ, একই হাসপাতালের এপ্রোচ ভবনের পাশের স্যুয়ারেজ লাইন ও ভূ-গর্ভস্থ লাইন মেরামতের নামে ২০ লাখ, ঢাকা একই হাসপাতালের ওপিডি ভবনের ৩য় তলার ১২, ৩১০ ওয়ার্ডের মেরামতের জন্য ৩০ লাখ, হাসপাতালের বহিঃবিভাগের ৩য় তলার পশ্চিম পাশের ছাদের পানি পড়া বন্ধকরণের নামে ৭ লাখ, একই হাসপাতালের ওটি বিল্ডিং এর ২য়, ৩য় ও ৪র্থ তলার থাই এ্যালুমিনিয়ামের দরজা জানালা নবায়ন ডাক্তার নার্স ও রোগীদের টয়লেট সমূহের মেরামত ও সংস্কারের নামে ২০ লাখ, হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ইউনানিটি বিল্ডিং এবং মূল ভবনের ছাদের জরাজীর্ণ পাইপ লাইনসমূহ পরিবর্তনসহ আনুসাঙ্গিক কাজের বিপরীতে ১০ লাখ, হাসপাতালের পরিচালক এর কক্ষের মেরামত ও সংস্কারের নামে ১৫ লাখ, একই হাসপাতাল-২ এর ৩য় তলায় সিসিইউ এর পাশে ছাদের উপরে টিনের ছাউনী দিয়ে সিসিইউ ওয়ার্ড সম্প্রসারণের জন্য ৪৫ লাখ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের ১১ তলা ভবনের নীচতলায় জরুরী বিভাগের ওয়ার্ড ডক্টরস রুম সংলগ্ন লাউঞ্জসহ করিডোর এবং বারান্দায় সিলিং ও সানিটারী সংস্কারসহ আনুসাঙ্গিক মেরামতের নামে ২৯ লাখ ৯২ হাজার টাকার কাজ, সলিমেক হাসপাতালের ১১তলা ভবনের নীচতলার ক্যাজুয়ালটি ওটি ও ওয়ার্ডের আধুনিকায়নের জন্য ২৬ লাখ ৩০ হাজার, সলিমেক হাসপাতালের ১১তলা ভবনের গাইনী সার্জারী ও কিড এওওয়ার্ড ভবনের সাধারন টয়লেট ব্লকে আরসিসি বেসিন স্থাপনের নামে ৯ লাখ ৯৭ হাজার এবং একই হাসপাতালে ১১তলা ভবনের ৩য় তলার স্পেশাল ওটি ৭ম তলার এনআইসি ইউ ৮থ তলার অর্থোপেডিক বিভাগ নিউরোলজি ওটি সংলগ্ন ডাক্তার নার্সদের কাপ্রে ড্রেস চেঞ্জ করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামতের নামে: ১২ লাখ ৭১ হাজার টাকার কাজগুলোতে ব্যাপক জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বরাদ্দের বেশীরভাগ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এছাড়া ম্যানুয়ালি কোটেশন করেও সাশ্রয়ের প্রায় দেড় কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাঠ কর্মকর্তা। ডিভিশনটির অধীনে সরকারী কর্মচারী হাসপাতালের ফিনিসিং কাজে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। একাজে জুন মাসে অগ্রীম বিল দিয়েও ৩৭.৫%হারে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম। অবৈধ টাকার গরম দেশ-বিদেশে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাডের অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী।
এ বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি গত্যনুগতকিকভাবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার নাম করে দুই এসডিই’র ৫% নেওয়ার বিষয়ে জানালে তিনি লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে কয়েকবার যোগাযোগ করেও সংযোগ স্থাপন করা যায়নি।