শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
শেষ দেখা হলো না ছেলের সাথে: জেলখানায় যাওয়ার পথে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন বাবা তাড়াইলে মৃত ব্যক্তির কাফনের কাপড় কাটা ও হক বিষয়ক বাস্তব প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত মোরেলগঞ্জে কলেজছাত্র জাহিদুলের রহস্যজনক মৃত্যু পটুয়াখালী এলজিইডি যেন এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য! গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: প্রধানমন্ত্রী আদমদীঘিতে পুকুর থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার মোরেলগঞ্জে নানা আয়োজনে পালিত হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ তাড়াইলে জুলাই-গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিএনপির আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, শহীদ পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে যা যা প্রয়োজন সব করা হবে — তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

পটুয়াখালী এলজিইডি যেন এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য!

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৭৫৯ বার পঠিত
নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে টানা এক যুগ একই দপ্তরে , ঠিকাদারি ও কেনাকাটায় অনিয়মের পাহাড়! সহকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় যেন একজন সহকারী প্রকৌশলীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বদলি সংক্রান্ত সরকারি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও টানা এক যুগ (১২ বছর) ধরে তিনি একই জেলা দপ্তরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ঠিকাদারদের সাথে অংশীদারত্বে ব্যবসা, ভুয়া বিল উত্তোলন, এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে চরম অসদাচরণের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগের তির এলজিইডি পটুয়াখালীর সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কামাল হোসেনের দিকে।

বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা নেই:

স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখার নীতিমালা (স্মারক নম্বর: ৪৬.০৬৭.০১৫.০০.০০.০৬৬.২০১৫-৫২৭) এর (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের সহকারী প্রকৌশলীকে নিজ জেলা এবং স্পাউসের জেলা ব্যতীত অন্য যে কোনো জেলায় বদলি বা পদায়ন করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মানুযায়ী মো. কামাল হোসেনের নিজ জেলায় চাকরি করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া নীতিমালার (খ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে—কোনো কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ ৩ (তিন) বছরের জন্য কোনো জেলায় বদলি বা পদায়ন করা হবে এবং একই জেলায় ৩ বছর অতিক্রম হলে তাকে আবশ্যিকভাবে অন্যত্র বদলি করতে হবে।

অথচ সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে মো. কামাল হোসেন বিগত প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ৩টি ভিন্ন ধাপে ঘুরেফিরে পটুয়াখালী এলজিইডিতেই অবস্থান করছেন। নিজ জেলায় বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বহাল তবিয়তে থাকার নেপথ্যে তিনি উচ্চ মহলে আর্থিক সুবিধা প্রদান করেন মর্মে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় বদলে office জুড়ে প্রভাব বিস্তার করে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মাননিয়ন্ত্রণ শাখায় স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের সিন্ডিকেট:

অনুসন্ধানে জানা যায়, এলজিইডির মাননিয়ন্ত্রণ শাখাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন কামাল হোসেন। ওই শাখায় নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের এক ভাতিজাকে বসিয়ে রেখে ঠিকাদারদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করার অভিযোগ উঠেছে।

ঠিকাদাররা কাজের বিল পাসের জন্য মাননিয়ন্ত্রণ শাখায় এলে কাজের মানে কাল্পনিক ত্রুটি ধরে বিল আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ‘কাজের মান ঠিক নেই’—এমন ভয় দেখিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয় এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।

টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটা ও ভুয়া বিল উত্তোলন:

২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রুটিন মেইনটেনেন্স কাজের নির্বাচিত ঠিকাদারদের চাপ দিয়ে নিজে নামমাত্র কাজ করে অর্থ আত্মসাৎ করেন। প্রতি বছর এই ৫০ লক্ষ টাকার বরাদ্দ যেন তার ব্যক্তিগত ব্যবসার মূলধনে পরিণত করেছেন। এর আগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যতবার এই দপ্তরে কর্মরত ছিলেন, তিনিই এই অর্থ ব্যয় করেছেন; কিন্তু তার নিজের ব্যবসার উন্নতি ছাড়া রাস্তার কোনো উন্নতি হয়নি। জানা যায়, এক প্রভাবশালী ঠিকাদারকে ব্ল্যাকমেইল করে কাজটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন কামাল হোসেন। পরবর্তীতে কোনো মালামাল ক্রয় না করেই তিনি বিল উত্তোলনের চেষ্টা চালান। তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মালামাল না কিনে বিল প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে, তাঁর ওপর চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা বদলি হলে পরে যোগদান করা মোঃ বোরহান উদ্দিন নামক কর্মকর্তার সহায়তায় মালামাল ক্রয় ছাড়াই ওই ভুয়া বিল পাস করিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে অফিসে অভিযোগ রয়েছে।

নথিপত্র জালিয়াতি, এসিআর সংশয় ও অসদাচরণ:

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) অনুস্বাক্ষরের জন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর আবশ্যিক। তবে কামাল হোসেনের ২০২৫ সালের জানুয়ারি–এপ্রিল মাসের আংশিক এসিআর-এ নেননি সেই সময়কার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর; বরং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হেড অফিসে জমা দিয়েছেন—তা নিয়ে অফিসে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ববর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসারকে বাদ দিয়ে এসিআর সংগ্রহ করা সরকারি চাকরির আচরণবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন। জানা গেছে, অসদাচরণের দায়ে এসিআর-এ নম্বর কম পাওয়ার এবং পদোন্নতি আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়।

সহকর্মী ও কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের সঙ্গে অশোভন আচরণের রেকর্ড রয়েছে তাঁর। গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে কার্যালয়ের রেস্ট হাউজে এক বিশেষ অতিথির সাথে কামাল হোসেনের ছোট ভাই দেখা করতে চাইলে কর্তব্যরত পুলিশ ও আনসার সদস্যরা বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর নিষেধ সত্ত্বেও কামাল হোসেন আনসার কমান্ডার ও সদস্যদের অকথ্য ভাষায় সবার সামনে গালাগাল করেন। এ কারণে তাঁকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়। তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত ওই সতর্কীকরণে তাঁর আচরণকে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর বিধি ২(এফ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এবং বিধি ৪(৫)(সি) অনুসারে দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল; আর এই ঘটনার পরই ঘটে এসিআর জালিয়াতির ঘটনা।

অফিসিয়াল কাজের দক্ষতা ও প্রশাসনিক আচরণে ঘাটতি:

সহকারী প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকলেও অফিসিয়াল দাপ্তরিক চিঠিপত্র বা নথি পর্যালোচনার মৌলিক দক্ষতা কামাল হোসেনের নেই বলে জানিয়েছেন দপ্তরের একাধিক কর্মচারী। অফিসের কম্পিউটার অপারেটরের ওপর নির্ভর করেই তিনি দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে নেন।

অভিযুক্ত সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কামাল হোসেনের বক্তব্য:

অভিযুক্ত পটুয়াখালীর এলজিইডি;র সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কামাল হোসেনের সাথে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট। তার নিজ জেলা  পটুয়াখালী বলে স্বীকার করেন, তবে কিভাবে সংশ্লিষ্ঠদের ম্যানেজ করে নিজ জেলায় চাকরি করছেন মর্মে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।

সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য:

পটুয়াখালীর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী হোসেন আলী মীরকে সেখানে কর্মরত থাকাকালীন সময়  সহকারী প্রকৌশালী কামালের অনিয়ম জালিয়াতির  ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়ে একাধিকবার কল এবং মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য:

​বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে পটুয়াখালীর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো: ওলীয়ার রহমান জানান, “আমি মাত্র কয়েকদিন হলো এখানে যোগদান করেছি। আপনার উল্লেখ করা অভিযোগগুলোর সত্যতা থাকলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি:

দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দীর্ঘমেয়াদী একই কর্মস্থলে অবস্থান এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের যে পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে—তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অডিট নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন ঠিকাদার মহলের দাবি, পটুয়াখালী এলজিইডির সামগ্রিক কাজের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে (দুদক) তদন্ত হওয়া উচিত।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..