শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
মির্জাগঞ্জে বারেক-খালেক দুই সহদরের জালিয়াতি! মৃত মানুষের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া দলিল, সিআইডির প্রতিবেদন দাখিল বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ নির্দেশনা ভাসছে চট্টগ্রাম, বন্যার শঙ্কায় উত্তর জনপদ নান্দাইলে কৃষকদের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর মতবিনিময় দত্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত একাডেমিক ভবনের শুভ উদ্বোধন করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি বিয়ানীবাজারে পিতা দায়ের কোপে নানা বাড়িতে বিবাহিত মেয়ে নিহত বেতাগীতে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেল, শতাধিক পরিবার পানিবন্দি জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিউইয়র্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন বিএনপি নেতা সেলিম রেজা নাটকীয়তা ছড়ানো রুদ্ধশ্বাস জয়ে শেষ আটে আর্জেন্টিনা মির্জাগঞ্জে তথ্য জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকদের অবরুদ্ধের ঘটনায় এবার জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর অভিযোগ

মির্জাগঞ্জে বারেক-খালেক দুই সহদরের জালিয়াতি! মৃত মানুষের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া দলিল, সিআইডির প্রতিবেদন দাখিল

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫৭৫২ বার পঠিত
জালিয়াতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ বারেক সিকদার ও তার ৫ ভাই-বোনের বিরুদ্ধে সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে।

মির্জাগঞ্জে বারেক খালেক জালিয়াতি করে একই এলাকার  রুহুল আমিনের একরের বেশি জমি জাল দলিল করে মিউটিশন রেকর্ড করে নিজেদের নামে বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১৯৬৩ সালে ১৮ এপ্রিল ৮৮৩ নং দলিল মুলে এই জমি আত্মস্যাৎ করেন। একই দলিলের তিন জায়গায় তিন রকম জমির হিসাব পাওয়া গেছে। প্রথম পাতায় জমির পরিমাণ ৬ একর ৭৫ শতাংশ, শেষভাগে তফসিলে ৭ একর ২১ শতাংশ, আর ভিতরে দাতাদের জমির হিস্যা যোগ করে দেখা যায়  ৯ একর ৭১ শতাংশ জমি দলিল করা হয়েছে। এখানেই খালেক-বারেকের জালিয়াতি শেষ নয়; সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে  দলিলের প্রথম পৃষ্ঠায় দাতার ক্রমিক নম্বর ৫-এর পর সরাসরি বসানো হয়েছে ৮, মাঝখান থেকে ৬ ও ৭ নম্বর ক্রমিকের কোনো দাতার নামই নেই, অথচ নিচে দাতার নাম ৯ জন উল্লেখ থাকলেও সই ও টিপসই নেওয়া হয়েছে ১০ জনের!

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কোটি টাকা মূল্যের পৈতৃক বায়া সম্পত্তি গ্রাস করতে এমনই এক অবিশ্বাস্য অভিনব ‘গায়েবি’ দলিল তৈরি করেছেন এই বারেক-খালেক চক্র: তবে শেষ রক্ষা হয়নি এদের । সিআইডির (CID) দীর্ঘ ও নিবিড় দালিলিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই জালিয়াতির পুরো আদ্যোপান্ত। এই জালিয়াতির মূল হোতা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হলেন উপজেলার ছৈলাবুনিয়া গ্রামের মৃত ইসমাইল সিকদারের মেজ পুত্র মো. আবদুল বারেক সিকদার (৫২)।

​সিআইডি পটুয়াখালী জেলার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) বিপ্লব মিস্ত্রীর দাখিল করা চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বারেক সিকদারসহ তার ৫ ভাই-বোনের বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৪০৬/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৫০৬(ii)/১১৪ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য ও প্রমাণিত হয়েছে। সিআইডি ঢাকা সদর দপ্তরও এই প্রতিবেদনের সাথে একমত পোষণ করে তা বিজ্ঞ আদালতে দাখিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে।

যেভাবে ফাঁস হলো ‘গায়েবি’ দলিলের রহস্য:

​আদালত ও সিআইডি সূত্রে জানা যায়, মির্জাগঞ্জ থানাধীন ছৈলাবুনিয়া মৌজার নিজের  জমি রক্ষা করতে মোঃ রুহুল আমিন বাদী হয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা (নং-১১১/২০২৫) দায়ের করেন। মামলার বিবাদীরা হলেন-আবদুল বারেক সিকদার, মোঃ আঃ খালেক সিকদার, আবদুল কুদ্দুস সিকদার, রোকেয়া বেগম, আলেয়া বেগম ও মোসাঃ রেহেনা। আদালত মামলার সত্যতা নিরূপণে প্রথমে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার দিগ্বিজয় গাইনকে দায়িত্ব দেন এবং পরবর্তীতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য বিশেষায়িত সংস্থা সিআইডিতে ন্যস্ত করেন।

​তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি কর্মকর্তা বিপ্লব মিস্ত্রী অনুসন্ধানের স্বার্থে বরগুনার আমতলী আদালতের একটি মামলার নথি থেকে ১৯৬৩ সালের খেপুপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মূল ‘থাম বহি’ (ভলিউম নং-০২/১৯৬৩) সংগ্রহ করেন। বিবাদী বারেক সিকদার দাবি করেন , ১৯৬৩ সালের ১৮ এপ্রিলের ৮৮৩ নং দলিলের মাধ্যমে তার বাবা ইসমাইল সিকদার এই জমির মালিক হন। কিন্তু সিআইডি যখন আমতলী আদালত থেকে সংগৃহীত মূল থাম বহির ৮৩ নম্বর পৃষ্ঠা যাচাই করে, তখন দেখা যায়—১৯৬৩ সালের ৩ এপ্রিলের আসল ৮৮৩ নম্বর দলিলের দাতা ছিলেন ‘মেসের আলী মোল্লা’ (Meser ali molla)।  এখানে উল্লেখ্য যে বারেক সিকদার যে  দলিলটি সি আইডি তদন্ত টিমের কাছে জমা দিয়েছে তাতে দাতা হিসেবে উল্লেখ আছে বন্দে আলী, মফেজ, সহরভানু বিবি রহমজানদের নাম। এখানে বারেকের দেওয়া ঐ দলিলের  সাথে সরকারি এই মূল নথির দূরতম কোনো মিল নেই। বারেকের ভাষ্যমতে  ১৯৬৫ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পটুয়াখালী জেলার খেপুপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বহি বিনষ্ট হয়ে গেছে। বারেক সেই সুযোগ নিয়ে  এই জাল সইমোহর ও ভূয়া দলিলটি তৈরি করেছিল।

সিআইডির প্রতিবেদনে উঠে আসা জালিয়াতির প্রধান প্রমাণসমূহ:

​তিনটি দলিলে তিন রকম লেখা:  বারেক কর্তৃক নামজারি (মিউটেশন) অফিসে জমা দেওয়া দলিলের লেখার সাথে সিআইডির তদন্ত  অফিসারের কাছে এবং পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বারেকের জমা দেওয়া দলিলের লেখার স্পষ্ট অমিল ও ভিন্নতা পাওয়া গেছে। সিআইডি এটিকে জালিয়াতির প্রধান ধরন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

একই জমি বারবার কেনা:

সিআইডি তদন্তের নথি সূত্রে জানা যায় , বারেক সিকদারের পিতা ইসমাইল সিকদার ১৯৬৩ সালে ৮৮৩ নং দলিলমূলে এই সম্পত্তি ক্রায়সূত্রে মালিক হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে বেতাগী সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে থেকে একই জমি  ২০০২সালে  ক্রয় করেন এবং ২০০৫ সালে একই জমি  মির্জাগঞ্জ সাব-রেজিষ্টি অফিস থেকে  ভিন্ন ভিন্ন দলিল মূলে পুনরায় একই সম্পত্তি কেন কিনলেন? নিজের কেনা জমিই পুনরায় সন্তানদের নামে কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই, এতে   প্রমাণ করে ১৯৬৩ সালের  ৮৮৩ নং দলিলটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং জাল।

অগ্রক্রয় মামলা খারিজ:

ভুয়া দলিলের ওপর ভিত্তি করে জমির মালিকানা দাবি করে ইসমাইল সিকদার ও তার ছেলেরা দেওয়ানি অগ্রক্রয় মামলা (নং-০২/২০০৩ ও ১৪৮/২০২৩) দায়ের করলেও বিজ্ঞ আদালত তাদের সেই মামলাটি খারিজ করে দেন।

আপন ভাইদেরও ছাড়েননি জালিয়াতির  ‘মাস্টারমাইন্ড’ বারেক: পারিবারিক ট্র্যাজেডি:

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পুরো জালিয়াতি ও প্রতারণার মূল কারিগর আবদুল বারেক সিকদার। এলাকার নিরীহ মানুষের জমি গ্রাস করাই শুধু তার পেশা, তার লোভের হাত থেকে রেহাই পায়নি নিজের আপন ভাইয়েরাও।

​বারেক সিকদারের আপন বড় ভাই ছিলেন আব্দুল রব। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে (বিদেশে) থেকে হাড়ভাঙা খাটুনির কোটি কোটি  টাকা দেশে মেজ ভাই বারেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন নিজের নামে জমি কেনার জন্য। কিন্তু বারেক সেই টাকা সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করে নিজের নামে সুবিদখালী এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরে আলিশান সম্পত্তি ও জমি গড়ে তোলেন। প্রবাস থেকে ফিরে নিজের সারাজীবনের উপার্জিত টাকা ও জমি  হিসাব চাইলে বারেক কোন হিসাব দিতে রাজি হননি। আব্দর রব তার সম্পত্তি আত্মসাতের এই চরম শোক এবং মেজ ভাই বারেকের দেয়া ক্রমাগত মানসিক আঘাতে একপর্যায়ে স্ট্রোক করে মারা যান। শুধু বড় ভাই-ই নয়, ছোট ভাই কুদ্দুসকেও বারেক বিভিন্ন সময়ে সম্পতিতে ঠকিয়েছেন।

পারিবারিক এই নির্মমতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে সিআইডির সাক্ষ্য গ্রহণে: স্বামীর ওপর বারেকের এই নির্মম অত্যাচার ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে সিআইডি কর্মকর্তার কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন খোদ প্রয়াত বড় ভাই আব্দুর রবের স্ত্রী মোসাঃ রাবেয়া বেগম।

খুন লাশ গুমের হুমকি:

​সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৮/০৪/২০২৫ খ্রিঃ তারিখ সকাল ১০ ঘটিকায় মামলার বাদী ও সাক্ষীরা বারেক সিকদারের ঘরে গিয়ে এই জালিয়াতির কারণ জানতে চাইলে বারেক ও তার ভাই খালেক সিকদার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, “জাল দলিল করেছি, জমাখারিজও করেছি। তুই জমি ছেড়ে দে, না হলে তোকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলব।” এই ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ ১৪ জন নিরপেক্ষ ও মানিত সাক্ষী সিআইডির কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বর্তমান অবস্থা:

​সিআইডি ঢাকা সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার (পটুয়াখালী এর পক্ষে) গত ২৪/০৫/২০২৬ খ্রিঃ স্মারক নং-৯২৪ মূলে বারেক সিকদারসহ ৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ধারা মোতাবেক প্রতিবেদন দাখিলের অনুমোদন দেন। এর প্রেক্ষিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা বিপ্লব মিস্ত্রী বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মির্জাগঞ্জে চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। আদালত তদন্ত রিপোর্ট আমলে নিয়ে জালিয়াত চক্রের ৬ জনের নামেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। বিষয়টি নিশ্চত করেন মির্জাগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ, তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন আমরা গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেয়েছি আসামি গ্রেফতার করার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। জমি জালিয়াতির এই চক্রের মূল হোতা বারেক ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে মামলার বাদি রুহুল আমিন বলেন বারেক ও খালেক এরা ২ ভাই মিলে এলাকার অনেক নিরিহ মানুষ এবং তার আপন ভাইয়ের জমি-জমা জালিয়াতি করে নিজেদের নামে লিখে নিয়েছে। বারেক এতোই ধুরন্দার যে, তার আপন বড় ভাইয়ের এতিম সন্তানেরা আজ অসহায় অথচ বারেক তার আপন ভাই রবের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে  আমরা এই জালিয়াত চক্রের বিচার চাই।

অভিযুক্ত বারেক-খালেক সিকদারের বক্তব্য:

অভিযুক্ত বারেক ও খালেক সিকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, নিউজ করে কি করবেন ? নিউজ করেন দেখি কি হয়? আবার তারা মাইনুল নামে অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে দিয়ে ফোন করিয়ে প্রতিবেদককে নিউজ না করার জন্য হুমকী প্রদান করেন।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..