জাবির ইবনে হাইয়ানকে পৃথিবীর সর্বপ্রথম রসায়ন বিজ্ঞানী বলা হয় । অবশ্য তার পূর্বেও রসায়ন চর্চা ছিল। কিন্তু তার কোন অস্তিত্ব ছিল না। রসানকে সাধারণ মানুষসহ বিদ্বান সমাজেও ভয়ের চোখে দেখতো। এমনি এক সময়ে জাবির ইবনে হাইয়ান কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রসায়নকে চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গণিতের সমপর্যায়ে নিয়ে আসেন। জাবির ইবনে হাইয়ানের পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান আল কুসী। তিনি আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান নামেও পরিচিত। কেউ আবার তাকে ‘আল হারুনী’, ‘আল সুফী’ নামেও অভিহিত করেন।
ইউরোপে তিনি জিবার ( এবনবৎ) নামে পরিচিত। তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। যতদূর জানা যায় তিনি ৭২২ মতান্তরে ৭৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা না গেলেও জাবির ইবনে হাইয়ানের জীবনীকারদের মধ্যে অন্যতম আল জিলকাদী তার কিতাবুল বুরহান ফি ইলমুল মাজারে উল্লেখ করেছেন,’ আজাদ বংশীয় জাবির কূফায় জন্মগ্রহণ করেন’। তাঁর পিতার নাম হচ্ছে হাইয়ান। তিনি ছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা চিকিৎসকদের একজন। বর্ণনা আছে, পিতার মতো তিনিও চিকিৎসা সেবা দিয়ে জীবন শুরু করেন। তবে তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা শুরু হয় হারুন অর রশীদের রাজত্বকালে (৭৮৬-৮৯০ ঈসায়ী) । কূফায় তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছিলো।
ফিহরিস্তের মতে, তাঁর রসায়নাগারও এখানে স্থাপিত হয়।তিনিই সর্বপ্রথম নাইট্রিক এসিড এবং সালফিউরিক এসিড আবিষ্কার করেন। তিনি চামড়া ও কাপড়ে রং করার প্রণালী, ইস্পাত প্রস্তুত করার পদ্ধতি,লোহা, ওয়াটার গ্রুফ কাপড়ে বার্নিশ করার উপায়,সোনার জলে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লৌহের ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন।সে মহাবিজ্ঞানী দুই হাজারেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।তবে এগুলোর গড় পৃষ্ঠা ৮/১০ এর মতো, এমনকি অনেকগুলো পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র দুই টি। তবে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে একটি বই – ই রচনা করেন।যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩০০ ।
বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রণীত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রসায়নে ২৬৭ টি, যুদ্ধাস্ত্রাদিতে ৩০০ টি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ৫০০ টি দর্শনে ৩০০ টি, কিতাবুত তাগাদির ৩০০ টি, দার্শনিক ও যুক্তিখন্ডন বিষয়ক ৫০০ টি উল্লেখযোগ্য।রসায়ন বিষয়ক রচনা জাবির ইবনে হাইয়ানকে অমর করে রেখেছে।এ বিষয়ে তাঁর কয়েকটি শ্রেষ্টতম রচনা হলো: ‘ কিতাবুর রহমত ‘, ‘ কিতাবুত তাজমী’, এবং ‘চিবাক উশ শরকী’ । জাবিরের রাসায়নিক কার্যাবলী আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর জীবনীকারদের মধ্যে এম. আকবর আলী লিখেন, ‘ রসায়ন শাস্ত্রকে ব্যবহারিক বিজ্ঞান হিসাবে কাজে লাগিয়ে নিতে যে সমস্ত প্রক্রিয়ার সাহায্য নিতে হয়,জাবির তার প্রায় সবগুলোর সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন’ ।
বিশ্ব বিখ্যাত এ মনোষীর মৃত্যু তারিখ নিয়েও মতভেদ রয়েছে।যতদূর জানা যায়,তিনি ৭৭৬ মতান্তরে ৮১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রসায়নবিজ্ঞানে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনিই রসায়ন বিজ্ঞানের জনক।