মিশর—এক বিস্ময়ের দেশ, যেখানে ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস, প্রাচীন মিশরের বিস্ময়কর স্থাপত্য এবং নীল নদীর স্নিগ্ধতা একসঙ্গে মিশে আছে। এই ভ্রমণে আমি দেখেছি গিজার পিরামিড, সালাহউদ্দিন আয়ুবির দুর্গ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, হযরত হুসাইন (আ.)-এর মাজার, খান এল খলিল বাজার, ইউসুফ (আ.)-কে বিক্রি করা বাজার, মিসরের জাতীয় জাদুঘর, ফেরাউনকে রাখা বিশেষ জাদুঘর এবং নীল নদের শাখা নদীর পাড়ে হাঁটার এক স্বপ্নময় মুহূর্ত। প্রতিটি স্থানই একেকটি ইতিহাসের জীবন্ত চিহ্ন। আসুন, আপনাদের সেই অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে জানাই।
◾গিজার পিরামিড: পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের এক বিস্ময়-
মিশরে পা রাখার পর প্রথমেই আমার যাত্রা গিজার পিরামিডের দিকে। বিশাল মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই পিরামিডগুলো সত্যিই এক বিস্ময়।
খুফুর পিরামিড, খাফরে পিরামিড এবং মেনকাউরের পিরামিড হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের অতল গভীর থেকে উঠে আসা এই বিশাল স্থাপনা দেখলে মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। সূর্যের আলোয় ঝলমলে পিরামিডের পাথরের গায়ে হাত রাখার মুহূর্তটি যেন ইতিহাসের ছোঁয়া পাওয়ার মতো।
যতই সামনে এগিয়ে যাই, ততই মনে হয় যেন হাজার বছরের পুরনো এক সভ্যতার প্রাণস্পন্দন অনুভব করছি। পিরামিডের প্রতিটি পাথরের গায়ে লুকিয়ে আছে অসংখ্য রহস্য, যার সমাধান আজও বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেছেন। বিশেষ করে খুফুর মহা পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে যখন মাথা উঁচু করে চূড়ার দিকে তাকালাম, তখন এক অবর্ণনীয় বিস্ময় আমাকে ঘিরে ধরেছিল।
পিরামিডের অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিজ্ঞতা ছিল আরেক ধাপ শিহরণ জাগানো। সরু গ্যালারি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যেন আমি সময়ের সিঁড়ি বেয়ে অতীতে ফিরে যাচ্ছি। ফারাওদের সমাধি কক্ষে পৌঁছানোর পর সেই নিস্তব্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম প্রাচীন মিশরীয়দের শিল্প, বিশ্বাস ও ক্ষমতার প্রতীক।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক অনন্ত রহস্যের অংশ হয়ে গেছি। এ এক অনুভূতি, যা শুধু সেখানে গিয়ে নিজ চোখে দেখলেই উপলব্ধি করা যায়—এক আকাশচুম্বী অভিজ্ঞতা, যা আজীবন স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে।
◾সালাহউদ্দিন আয়ুবির দুর্গ: ইসলামের এক গৌরবময় স্মৃতি-
এরপর যাত্রা করি কায়রোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা সালাহউদ্দিন আয়ুবির দুর্গে (Citadel of Saladin)। এটি নির্মাণ করেছিলেন ইসলামের মহান বীর সালাহউদ্দিন আয়ুবি ১২শ শতকে, ক্রুসেডারদের হাত থেকে মিশরকে রক্ষা করার জন্য।
এই দুর্গের ভেতরে রয়েছে বিখ্যাত মুহাম্মদ আলী মসজিদ, যা তার অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর জন্য পরিচিত। দুর্গের উঁচু প্রাচীর থেকে পুরো কায়রো শহর দেখা যায়, যা সত্যিই চমৎকার।
◾আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়: ইসলামী শিক্ষার আলোকবর্তিকা-
এরপর গেলাম আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা শুধু মিশর নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৯৭২ সালে ফাতেমীয় শাসকদের সময়ে এবং আজও ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে প্রবেশ করে মনে হলো, এখানে যুগ যুগ ধরে ইসলামের জ্ঞানচর্চা হয়ে আসছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা কুরআন, হাদিস, ফিকহ, এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে।
◾হযরত হুসাইন (আ.)-এর মাজার: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক পবিত্র স্থান-
এরপর গেলাম হযরত হুসাইন (আ.)-এর মাজারে, যা কায়রো শহরের অন্যতম পবিত্র স্থান। এখানে রাখা আছে মহান ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাথার খুলি, যা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর মিশরে নিয়ে আসা হয় বলে মনে করা হয়।
মাজারের ভেতরে প্রবেশ করতেই এক আধ্যাত্মিক অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করল। কারবালার সেই বেদনাময় ইতিহাস মনে পড়ে গেল, যেখানে ইমাম হুসাইন (আ.) সত্য ও ন্যায়ের জন্য শাহাদাত বরণ করেছিলেন।
◾খান এল খলিল বাজার: ঐতিহ্যের রঙিন মেলা-
এরপর গেলাম কায়রোর বিখ্যাত খান এল খলিল বাজারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এবং জনপ্রিয় বাজার, যেখানে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, হস্তশিল্প, অলংকার, সুগন্ধি এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক পাওয়া যায়।
এখানে ঘুরে মনে হলো, এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। ছোট ছোট গলিগুলোতে শত শত দোকান, পথের ধারে কফির দোকান এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুবাস আমাকে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিলো।
◾ইউসুফ (আ.)-কে বিক্রি করা বাজার: কোরআনের ইতিহাসের জীবন্ত চিহ্ন-
এরপর গেলাম সেই বাজারে, যেখানে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর ভাইয়েরা বিক্রি করেছিল। কায়রোর পুরনো অংশে অবস্থিত এই জায়গাটি সুক আল-ইউসুফ নামে পরিচিত।
এখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো, সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গেছে। ছোটবেলায় কোরআনে পড়া সেই গল্প, যেখানে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি এই জায়গায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
◾মিসরের জাতীয় জাদুঘর: ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ-
এরপর গেলাম মিসরের জাতীয় জাদুঘরে (Egyptian Museum), যা কায়রোতে অবস্থিত। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, যেখানে ১২০,০০০-এর বেশি প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে।
এখানে এসে দেখলাম তুতানখামেনের সমাধি, তার সোনার তৈরি মুখোশ এবং অন্যান্য রাজকীয় সম্পদ।
◾ফেরাউনকে রাখা বিশেষ জাদুঘর: এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা-
এরপর গেলাম সেই বিশেষ জাদুঘরে, যেখানে ফেরাউনদের সংরক্ষিত করা হয়েছে। এটি “মমি রুম” নামে পরিচিত, যা মিসরের জাতীয় জাদুঘরের বিশেষ অংশ।
এখানে রাখা আছে কয়েকজন বিখ্যাত ফেরাউনের মমি, যার মধ্যে রামেসিস দ্বিতীয়, সেতি প্রথম, এবং অন্যান্য মিশরীয় রাজাদের দেহ সংরক্ষিত আছে।
এখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো, কতই না শক্তিশালী ছিল এই ফেরাউনরা, কিন্তু আজ তারা শুধুমাত্র এক টুকরো ইতিহাস! এটি আমাদের জন্য একটি বিরাট শিক্ষা—আল্লাহর বিরুদ্ধে অহংকার করলে কিভাবে শাস্তি আসে।
◾নীল নদের শাখা নদীর পাড়ে হাঁটা: এক স্বপ্নময় মুহূর্ত-
সন্ধ্যার সময় গেলাম নীল নদের শাখা নদীর পাড়ে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল, আর চারপাশের পরিবেশ ছিল একদম শান্ত। নীল নদ শুধু মিশরের প্রাণ নয়, এটি ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী।
নদীর ধারে বসে ভাবছিলাম, এই নদের জলে বয়ে গেছে কত সভ্যতার গল্প! এখান দিয়ে বয়ে গেছে মুসা (আ.)-এর জীবনকাহিনি, ফেরাউনের পতনের ইতিহাস, এবং আরও বহু ঘটনা।
◾শেষ কথা-
মিশর ভ্রমণ শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালা। এখানে এসে আমি ইসলামের ইতিহাস, মিশরীয় সভ্যতা, এবং মানবজাতির অতীত সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে পেরেছি।
* পিরামিডে গিয়ে দেখলাম প্রাচীন মিশরীয়দের বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলী।
* সালাহউদ্দিন আয়ুবির দুর্গে গিয়ে অনুভব করলাম ইসলামের গৌরবময় অতীত।
* আল-আজহারে গিয়ে উপলব্ধি করলাম ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব।
* ইউসুফ (আ.)-কে বিক্রি করা বাজারে গিয়ে কোরআনের জীবন্ত ইতিহাস দেখলাম।
* মিসরের জাতীয় জাদুঘরে ফারাওদের সভ্যতা এবং তাদের ধন-সম্পদের নিদর্শন দেখলাম।
* ফেরাউনের সংরক্ষিত দেহ দেখে বুঝতে পারলাম, দুনিয়ার শক্তি চিরস্থায়ী নয়।
এই ভ্রমণ আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। মিশর শুধু পর্যটনের জন্য নয়, বরং ইতিহাস, শিক্ষা, এবং ইসলামের নিদর্শন অনুধাবনের জন্যও একটি আদর্শ স্থান।