বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
সান্তাহারে যুবসমাজকে খেলাধুলা মুখী করতে বল বিতরণ আমতলীতে পিভিএ ও এনএসএস-এর উদ্যোগে কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা বিতরণ বন্ধ কারখানা মালিকদের সুখবর দিল প্রধানমন্ত্রী কামিল পাস করেও চাকরির অপেক্ষা নয়, ফাস্টফুড ব্যবসায় সফল শারমিন আমতলীতে বস্তাবন্দি অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার জনতা ব্যাংক পিএলসি নান্দাইল রোড বাজার শাখা স্থানান্তরের চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ : ১০১ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ তাড়াইল সদর ইউনিয়নে দুঃসময়ের সুহৃদ সাথী নূরে আলম সিদ্দিকী বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম-পরিচালক মাহফুজ উল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপির উদ্যোগে অতিরিক্ত ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ

গণপূর্তের আবু তালেবের শতকোটির জালিয়াতি

অনলাইন ডেস্ক:
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৫৮২৪ বার পঠিত

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ— জালিয়াতির এমন কোনো স্তর নেই যেখানে হাত দেননি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেব। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও ক্যাডার পরিচয় ধারণ, জ্যেষ্ঠতা জালিয়াতি এবং কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক সাম্প্রতিক অভিযোগে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি একাধিক খাতের অন্তত ১৬টি প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই ৫ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করেছেন। কেবল তাই নয়, প্রতিটি প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই ১০ শতাংশ কমিশন নিশ্চিত করা এবং নিজস্ব সিন্ডিকেটের বাইরে কাউকে কাজ না দেওয়ার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছেন।

নিয়োগ জালিয়াতি: ক্যাডার না হয়েও নির্বাহী প্রকৌশলী

আবু তালেবের উত্থানের গল্পটি সিনেমাটিক হলেও এর পরতে পরতে রয়েছে জালিয়াতির ছাপ। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কোনো বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে অবৈধভাবে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি; ২৭তম বিসিএস কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা অর্জন করেন এবং দ্রুততম সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। একজন নন-ক্যাডারের এভাবে ক্যাডার পরিচয়ে পদোন্নতি পাওয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত অর্থের ১৬টি উন্নয়ন ও মেরামত কাজে আবু তালেবের দুর্নীতির সবচেয়ে নগ্ন চিত্র ফুটে ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে বিল পরিশোধের কথা থাকলেও তিনি কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের যোগসাজশে পুরো বিল তুলে নিয়েছেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৫৬.৩ লাখ টাকা এবং ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৩৬.১২ লাখ টাকার মেরামত কাজ। সরেজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, নথিপত্রে কাজ সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো সংস্কার কাজই করা হয়নি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মেরামত কাজের সম্পূর্ণ অর্থ এভাবে হরিলুট করা হয়েছে।

ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ও নথির কারসাজি

কাজ না করে বিল উত্তোলনের বিষয়টি গোপন করতে আবু তালেব আশ্রয় নিয়েছেন নথিপত্র জালিয়াতির। কাজ শেষ হয়েছে— এমন মর্মে ‘ব্যাকডেটেড’ বা পূর্ববর্তী তারিখের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে নথিতে যুক্ত করেছেন তিনি। এটি সরকারি ক্রয় আইন এবং দণ্ডবিধির চরম লঙ্ঘন।

অভিযোগ রয়েছে, অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি অংশকে ম্যানেজ করে তিনি দিনের পর দিন এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো ঠিকাদার এর প্রতিবাদ করলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৮ এ আবু তালেব কায়েম করেছেন ‘কমিশন রাজ’। প্রতিটি প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই তাকে ১০ শতাংশ নগদ কমিশন দিতে হয়। তার নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যার বাইরে কোনো সাধারণ ঠিকাদারের পক্ষে কাজ পাওয়া অসম্ভব।

এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, আবু তালেবের দুর্নীতির কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা আজ ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অবৈধ সম্পদের পাহাড়

একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আবু তালেবের জীবনযাপন অত্যন্ত বিলাসবহুল। অবৈধ নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি তার বৈধ আয়ের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও এর আশপাশে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার এই সম্পদের উৎস খুঁজতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বিভিন্ন সংস্থা।

আবু তালেবের বিরুদ্ধে ওঠা এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই শুরু করেছে। অভিযোগকারী আমিনুল ইসলাম তার অভিযোগে জরুরি ভিত্তিতে আবু তালেবের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং তিনি যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন সেজন্য জরুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি

গণপূর্ত অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জর্জরিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধিদপ্তরের একাধিক প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান চালিয়েছে। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগে এ ধরনের অনিয়ম আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে একাধিক ঠিকাদার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, আবু তালেবের মতো কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ না করলে কোনো কাজ পাওয়া যায় না। কয়েকটি প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং কমিশনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

জাতীয় ক্ষুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ উল্লেখিত প্রকল্পগুলোতে কাজের অগ্রগতি নিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো প্রশ্ন তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ আংশিক সম্পন্ন দেখিয়ে পুরো বিল তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও সম্পদ জব্দ করা উচিত। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব রয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ই-টেন্ডারিং, থার্ড পার্টি মনিটরিং এবং ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে দুর্নীতি হলে সরকারি প্রকল্পের মান খারাপ হয়, সময়মতো কাজ সম্পন্ন হয় না এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়ে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ভবনের মেরামত কাজে অনিয়ম হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণপূর্তে একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে সিন্ডিকেট এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন এ অভিযোগটি যদি সুষ্ঠু তদন্ত হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা যাবে— এমনটাই মনে করছেন ভবনের সৎ প্রকৌশলীরা।

এসব বিষয়ে আবু তালেবের কাছে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..