মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
আজ বাঙালি জাতির গৌরবময় মহান বিজয় দিবস নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত : সিইসি ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেবে : উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপির শ্রদ্ধা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে হাতপাখা প্রতীকের শক্তি প্রদর্শন: প্রার্থীর নেতৃত্বে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বেগম খালেদা জিয়াকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল : সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী কিশোরগঞ্জ-১ আসনে রিকশার শোডাউন: মুফতি হাদীর প্রচারণায় উৎসবমুখর শহর মির্জাগঞ্জের নবাগত ইউএনও’র সাথে এমজেএফ নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ জনশক্তি রপ্তানি: মালয়েশিয়া ‘চক্রের হোতা’ স্বপনের ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

পদ্মা ব্যাংকের ১৬১৩ কোটি টাকা পাচার: নাফিজ সরাফাত ও স্ত্রী সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা

অনলাইন ডেস্ক:
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭৬৫ বার পঠিত
চৌধুরী নাফিজ সরাফাত

আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ব্যবসায়ী, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত এবং তার স্ত্রী-পুত্রসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১৬১৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।

বৃহস্পতিবার ঢাকার গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করার কথা সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

মামলায় বাকি আসামিরা হলেন- নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ, ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরী ও সহযোগী হাসান তাহের ইমাম।

প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাতে সিআইডি বলছে, চৌধুরী নাফিজ সরাফত তার সহযোগী ডক্টর হাসান তাহের ইমামকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৮ সালে ‘রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির লাইসেন্স নেন। ওই কোম্পানি ২০১৩ সালের মধ্যেই ১০টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়, বর্তমানে রেইসের অধীনে ১৩টি ফান্ড রয়েছে।

নাফিজ সরাফাত ও তার সহযোগীরা এই মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে ‘অবৈধ ব্যক্তিগত স্বার্থে’ ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

সেখানে বলা হয়েছে, “চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ ও সহযোগী ডক্টর হাসান তাহের ইমামের সঙ্গে মিলে ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগ করে তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) শেয়ার কেনেন এবং পরে ব্যাংকটির পরিচালক হয়ে যান। নাফিস সরাফাত ‘কৌশলে’ তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদকে সাউথইস্ট ব্যাংকেরও পরিচালক বানান।

তারা ফান্ডের টাকায় ‘মাল্টি সিকিউরিটিজ’ নামের একটি ব্রোকার হাউজ কিনে তার ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে ‘প্রতারণার মাধ্যমে ফান্ডের অর্থ হাতিয়ে নেন’ বলে সিআইডির ভাষ্য।

নাফিজ সরাফাত পদ্মা ব্যাংকের টাকা দিয়ে ‘পদ্মা ব্যাংক সিকিউরিটিজসহ’ তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ‘স্ট্র্যাটেজিক ইক্যুইটি’ নামের ফান্ড ক্রয়/বিনিয়োগ করেন যার অধীন একাধিক ফান্ড রয়েছে।

অনুসন্ধানের বরাতে সিআইডি বলছে, “জাল-জালিয়াতির ব্যাপ্তি এতই বিস্তিৃত ছিল যে, হিসাব বিও ও অন্যান্য ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনাসহ রাজউক থেকে একাধিক প্লট হাতিয়ে নিয়ে বিভিন্ন নামীয় প্রতিষ্ঠান/বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে বিদেশে অর্থ পাচারের পথ সুগম করেছিলেন অভিযুক্তরা।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ‘বেস্ট হোল্ডিংসের’ বন্ডে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চাপ প্রয়োগ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং একাধিক বাড়ি–ফ্ল্যাট কেনাসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়, যার প্রেক্ষিতে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট অনুসন্ধানে নামে বলে জানানো হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

সেখানে বলা হয়, অনুসন্ধানে নাফিজ সরাফাত এবং তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকে মোট ৭৮টি হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্টে প্রায় ১ হাজার ৮০৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জমা এবং প্রায় ১ হাজার ৮০৫ কোটি ৫৮ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী ও ছেলের নামে মোট ২১টি হিসাব চালু রয়েছে, সেখানে এখন মাত্র ২৯ লাখ ২১ হাজার টাকা রয়েছে। সেসব হিসাবের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা লেনদেন হওয়ায় তথ্য ও দলিল সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার কথা জানিয়েছে সিআইডি।

এর ভিত্তিতে সিআইডি বলছে, নাফিজ সরাফাত ও তার স্ত্রীর মালিকানায় কানাডায় দুটি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি এবং আঞ্জুমান আরা শাহীদের নামে সিঙ্গাপুরে একটি কোম্পানির ১৫টি যৌথ হিসাব রয়েছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে।

এছাড়া নাফিজ সরাফতের ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরীর নামে কানাডা, সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৭৬টি হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। দুবাইতে নাফিজ সরাফাতের ৩ রুমের একটি ফ্ল্যাট ও ৫ রুমের একটি ভিলা রয়েছে। আর সিঙ্গাপুরে হাসান তাহের ইমামের মালিকানাধীন একটি কোম্পানির ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছে সিআইডি।

অনুসন্ধানে বাংলাদেশেও তাদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।

সিআইডি বলছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে’ মোট ১ হাজার ৬১৩ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬৫৯ টাকা অর্জন, প্রতারণা, জালিয়াতি ও পাচারের অভিযোগে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে’ তারা মামলাটি দায়ের করেছে।

পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের কার্যালয় ‘স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ’ এবং গুলশানের ‘একটি প্লট হস্তান্তর করে অর্থ পাচারের’ অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে গত জুলাই মাসে দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

পদ্মা ব্যাংকের ৬৬ কোটি টাকার বেশি ‘আত্মসাতের অভিযোগে’ করা মামলায় নাফিজ সরাফাতসহ আসামি করা হয়েছে ১০ জনকে।

আর গুলশানের একটি প্লট হস্তান্তরের মাধ্যমে চার কোটি টাকার বেশি ‘পাচারের’ মামলায় তার সঙ্গে আসামি করা হয়েছে সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ আরও তিনজনকে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত তিন মেয়াদে আর্থিক খাতের অনিয়মে বারবার নাফিজ সরাফতের নাম এলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

উত্থানের শুরুটা শেয়ারবাজারে ফান্ড ম্যানেজমেন্ট দিয়ে হলেও গত দেড় দশকে নাফিজ হোটেল, বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার, আবাসন, মিডিয়া, অ্যাগ্রো, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডেরও চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার হাউসের (কানাডা) সভাপতি নাফিজ সরাফাত কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব ও আর্মি গলফ ক্লাবের সদস্য, ওয়ার্ল্ড চেজ ফেডারেশনের (বাংলাদেশ বিভাগ) সহসভাপতি, এমনকি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিরও সদস্য পদে আসীন হয়েছিলেন তিনি।

বলা হয়, মাত্র দেড় দশকে নাফিজের এই বিপুল সাফল্যের পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য, যার মাধ্যমে তিনি অনিয়ম করেও পার পেয়ে গেছেন। শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সঙ্গে নাফিজ সরাফাতের সম্পর্কের কথা ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতের সবারই জানা।

ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদক আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ীর মত নাফিজ সরাফতের বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু করে।

তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামে অর্থপাচার প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

গত বছরের অগাস্টে নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লোপাটের মাধ্যমে ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

এরপর নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেয় আদালত। এছাড়া তার পরিবারের ফ্ল্যাট, প্লট, বাড় ও জমি জব্দের আদেশ আসে। দুবাইয়ে থাকা নাফিজ সরাফতের ফ্ল্যাট ও ভিলা জব্দের আদেশ দেওয়া হয়।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..