বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি হত্যাকাণ্ড-শরিফ ওসমান হাদি ও আজিজুর রহমান মুসাব্বির—প্রমাণ করে, রাজনৈতিক পরিসর কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। এই দুই নেতার মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা।
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চ-এর মুখপাত্র এবং সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রাখতেন। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকার পুরানা পল্টনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যু হয়। তদন্তে হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চার্জশিটে ১৭ জনের নাম উঠে এসেছে, যাদের অধিকাংশের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের সংযোগ রয়েছে। হাদির মৃত্যুর পর দেশে যে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তা শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, এটি ক্ষমতা পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক উত্তেজনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
এর এক মাসের মধ্যেই, ৭ জানুয়ারি ২০২৬, ঢাকার কারওয়ান বাজারে গুলিতে নিহত হন বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির। প্রকাশ্য স্থানে এই হত্যাকাণ্ড নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ নির্বাচনকে যে কতটা বিপজ্জনক করে তুলতে পারে, তা এই ঘটনার মধ্যেই স্পষ্ট।
উভয় হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মিল স্পষ্ট। ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় হলেও সহিংসতার ধরনে কোনো পার্থক্য নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করেছে। মতবিরোধ থাকতেই পারে, প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে, কিন্তু তা যদি অস্ত্রের ভয়ভীতিতে প্রকাশ পায়, তাহলে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার নীরবতা সহিংসতার চক্রকে আরও গভীর করে। নিরপেক্ষ, দৃঢ় ও দ্রুত বিচার ছাড়া এ ধরনের হত্যাকাণ্ড থামানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকেও স্ব-সমালোচনার মাধ্যমে সহিংসতার পথ অবিলম্বে পরিহার করতে হবে।
শরিফ ওসমান হাদি ও আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ না হলে গণতন্ত্র বারবার রক্তাক্ত হবে। এই অশনিসংকেত আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার-যাতে রাজনীতির মাঠে আবারও যুক্তি ও মতের প্রতিযোগিতা ফিরে আসে এবং জীবন নিরপত্তা সুনিশ্চিত হয়।
সাখাওয়াত হোসেন
কলামিস্ট