বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন

পটুয়াখালীতে সেতুতে দৃশ্যমান ত্রুটি, অ্যাপ্রোচে পুরোনো ইটের খোয়া: রিপন দাসের তদারকি নিয়ে বিতর্ক

মনজুর মোর্শেদ তুহিন, (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
  • ৫৭৬৬ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গলাচিপা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি আরসিসি গার্ডার সেতুর কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নির্মাণ ত্রুটি এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃশ্যমান অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী রিপন দাসের উদাসীনতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত কাজ শেষ করে চূড়ান্ত বিল উত্তোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, CAFDRIRP প্রকল্পের আওতায় CAFDRIRP/পটুয়াখালী/VR-A/Brdg/ER/W-01/2023-24 প্যাকেজের অধীনে গলাচিপা ইউপিসি-গলাচিপা হাই স্কুল সড়কের ১৭৫০ মিটার চেইনেজে ৩৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ২ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স বসুন্ধরা হাউজ বিল্ডার্স, নওগাঁ।

বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮০ শতাংশ বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর মূল কাঠামোর কাজ দৃশ্যমানভাবে প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত নিচের দিকে দেবে গেছে বলে দৃশ্যত প্রতীয়মান হয়। এতে সেতুর মূল কাঠামো ও রেলিংয়ে বাঁকা অবস্থা লক্ষ্য করা যায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

যদিও প্রকৌশলগতভাবে লেভেল মেশিন ও অন্যান্য কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, তবুও দৃশ্যমান অবস্থার কারণে নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢালাইয়ের সময় নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে এবং নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে অদূর ভবিষ্যতে সেতুর স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

সেতুর দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কের প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যবহৃত খোয়ার মধ্যে পুরোনো ভবন ভাঙা ইটের অংশ এবং বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার সহজ খোয়া রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণবর্জ্য ও পুরোনো ইট ভেঙে এসব খোয়া তৈরি করা হয়েছে।

এছাড়া রাস্তার বেড প্রস্তুত ও কম্প্যাকশনের কাজও যথাযথভাবে করা হয়নি।

ট্রলি চালক আব্দুর রহিম বলেন, স্থানীয় ঠিকাদার মো. বাটু আমাকে এই রাস্তায় খোয়া দিতে বলেছে। গলাচিপা লঞ্চঘাট এলাকায় খোয়া ভেঙে বিক্রি হয়, আমি সেখান থেকে এনেছি। আমরা সবাই দেখতেছি এটা পুরাতন ইটের খোয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম ফকির বলেন, পুরাতন দালান ভেঙে তৈরি করা ইটের খোয়া এখানে দেওয়া হয়েছে। এগুলো দিয়ে রাস্তা করলে বেশি দিন টিকবে না।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ দুই বছর ধরে ব্রিজসহ রাস্তার কাজ চলছে। ঢালাইয়ের আগে রডের খাঁচা ঠিক ছিল। কিন্তু ঢালাইয়ের সময় দক্ষিণ মাথা রডের খাঁচাসহ দেবে যায়। যে পরিমাণ মাল দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি বলেই মাঝখান দিয়ে বাঁকা হয়ে গেছে। এখনো সেই অবস্থাই রয়েছে।

আরেক বাসিন্দা কবির হাওলাদার বলেন, এটা বিল্ডিং ভাঙা ইটের খোয়া। রাস্তায় বেশিদিন টিকবে না। বেড কাটা ঠিকমতো হয়নি, কম্প্যাকশনও হয়নি। জনগণের টাকা খরচ করে দায়সারাভাবে কাজ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী রিপন দাস কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেননি। নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ উঠলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
তাদের মতে, প্রায় ৩ কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে যদি দৃশ্যমানভাবে নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সংশ্লিষ্ট তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপসহকারী প্রকৌশলী রিপন দাস বলেন,
অ্যাপ্রোচ রাস্তায় কিছু পুরাতন ইটের খোয়া আছে, তবে বিল্ডিং ভাঙার মসলা মাখা ইট নেই এটা আমি নিশ্চিত। ব্রিজের কোনো পাশে বাঁকা নেই। আপনি আসেন, আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি।

গলাচিপা উপজেলা প্রকৌশলী বলেন,
কাজ করতে গেলে একটু ১৯-২০ হতেই পারে। আপনারা কোনো অসঙ্গতি পেলে নিউজের মাধ্যমে তুলে ধরুন।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় ৩ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্পে দৃশ্যমান নির্মাণ ত্রুটি ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগকে ‘১৯-২০’ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।

এলাকাবাসী সেতুর পাইল ফাউন্ডেশন, কংক্রিটের গুণগত মান, লেভেল, অ্যাপ্রোচ সড়কের নির্মাণসামগ্রী এবং সার্বিক নির্মাণমান পরীক্ষা করে একটি স্বাধীন কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, চূড়ান্ত বিল পরিশোধের আগে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি নিরীক্ষা করা হলে প্রকৃত অবস্থা উদঘাটিত হবে এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..