রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ গণভোটের প্রচার ও ভোটার সচেতনতা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করায় তালতলী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মানজুরুল হক কাওছারকে শোকজ করার ঘটনায় বরগুনার তালতলী ও আমতলী উপজেলায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও দ্বৈতনীতির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
জানা গেছে, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভাগীয় কমিশনার সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে দ্রুত উঠান বৈঠক ও জনসচেতনতামূলক সভা আয়োজনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন।
ওই নির্দেশনার আলোকে ১২ জানুয়ারি দুপুরে বরগুনার আমতলী উপজেলায় সমাজসেবা অফিসের উদ্যোগে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে একটি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সভায় সমাজসেবা বিভাগের শতাধিক সুবিধাভোগী অংশ নেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় নির্দেশ বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সেই দিনই মোঃ মানজুরুল হক কাওছারকে তালতলী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে অনুপস্থিত দেখিয়ে বরগুনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ শহিদুল ইসলাম শোকজ নোটিশ প্রদান করেন। স্থানীয়দের মতে, এটি দায়িত্ব পালনের জন্য শাস্তি দেওয়ার শামিল।
ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে একটি দাপ্তরিক প্রমাণ। ১২ জানুয়ারি দুপুর ১টা ১৪ মিনিটে বরগুনা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ‘ডি.এস.এস বরগুনা এ টু জেট’ গ্রুপে গণভোট কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য পোস্ট আকারে শেয়ার করা হয়। অর্থাৎ প্রশাসনের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মেই দায়িত্ব পালনের বিষয়টি দৃশ্যমান থাকার পরও শোকজ জারি করা হয়েছে।
এতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর প্রশ্ন—বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে, ইউএনওর উপস্থিতিতে এবং অফিসিয়াল গ্রুপে প্রচারিত কর্মসূচি যদি ‘অফিস ফাঁকি’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সরকারি দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা কী?
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন,
সরকার গণভোট করতে বলছে—এর মানে এই না যে ওই দিন সে অফিস করবে না। কর্তৃপক্ষ এমন কোনো নির্দেশ দেয়নি। সপ্তাহে একদিন অফিসে যাওয়ার কথা থাকলেও সেই দিন গণভোট করতে হবে—এভাবে সরকার চাপ দেয়নি। এটা এক ধরনের দুষ্টামি।
উপপরিচালকের এই বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের পাল্টা প্রশ্ন—যে কর্মসূচি বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে, ইউএনওর উপস্থিতিতে এবং জেলা অফিসের গ্রুপে শেয়ার হয়েছে, সেটি কীভাবে ‘দুষ্টামি’ হতে পারে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, একজন কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে আমতলী উপজেলায় মূল দায়িত্ব এবং তালতলী উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত সময় সমন্বয় না করেই শোকজ জারি করা হয়েছে। এতে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসের আয়োজনে ১২ জানুয়ারি গণভোট সম্পর্কে প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। এরপরও সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মানজুরুল হক কাওছারকে কীভাবে শোকজ করা হলো, তা আমার বোধগম্য নয়। জেনে–শুনে দাপ্তরিক বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে শোকজ আদেশ প্রত্যাহার করে বিভাগীয় নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তালতলী উপজেলায় দ্রুত একজন স্থায়ী সমাজসেবা কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।
এলাকাবাসী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির দায় নিয়ে মাঠে কাজ করা কর্মকর্তাদের যদি এভাবে হেয় করা হয়, তাহলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তাকে শোকজ করার ঘটনা নয়; বরং প্রশাসনের ভেতরের সমন্বয়হীনতা, দ্বৈতনীতি ও দায় এড়ানোর একটি বাস্তব চিত্র, যা এখন জনআলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের নির্দেশ পালন করাই যদি অপরাধ হয়, তাহলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন কীভাবে—এ প্রশ্নই এখন ঘুরে ফিরে আসছে।