গ্রামবাংলার মানুষ স্বভাবতই সহজ-সরল। পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক বন্ধন আর সম্মিলিত জীবনের ঐতিহ্যই তাদের মূল শক্তি। কিন্তু এই সহজ-সরলতাই অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে দাঁড়ায় বিপদের কারণ। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, উত্তরাধিকার সমস্যা কিংবা সামান্য কথাকাটাকাটি এমন নানা বিষয় থেকে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। আর এসব দ্বন্দ্ব মীমাংসার আশায় গ্রামের মানুষ শরণাপন্ন হন তথাকথিত গ্রাম্য মাতুব্বর বা শালিসীদের কাছে।
একসময় এই শালিস ব্যবস্থা ছিল গ্রাম সমাজের ন্যায়বিচারের অন্যতম মাধ্যম। অভিজ্ঞ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা সমাজের স্বার্থে নিরপেক্ষভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবস্থা আজ ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমানে অনেক গ্রাম্য মাতুব্বর ও শালিসী এই দায়িত্বকে পরিণত করেছেন আয়ের উৎসে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শালিসীরা নানা অজুহাত ও টালবাহানা করে অর্থ আদায়ের ফাঁদ পাতেন। কখনো “মীমাংসা করতে সময় লাগবে”, কখনো “উপরের লোককে খুশি করতে হবে” এমন অজস্র অযুহাতে আদায় করা হয় টাকা। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার বদলে তারা আরও হয়রানির শিকার হন।
এছাড়াও গ্রাম সমাজে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণির দালাল। কোথাও সামাজিক দ্বন্দ্বের খবর পেলেই তারা ছুটে যান ‘সমাধান’ করে দেওয়ার নামে। দু’পক্ষের মাঝে সমন্বয়ের আশ্বাস দিয়ে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই সুবিধা গ্রহণ করেন তারা। এতে দ্বন্দ্ব কমার বদলে অনেক সময় আরও জটিল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
এই তথাকথিত শালিস ব্যবস্থার অপব্যবহারের ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ আইনি পথেও যেতে ভয় পান। সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অক্ষমতা আর প্রভাবশালীদের দাপটে তারা নীরবে অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য হন। এর ফলে সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবক্ষয়ের মূল কারণ হলো ধর্মীয় ও সামাজিক শিক্ষার যথাযথ চর্চার অভাব। নৈতিকতা, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার শিক্ষা যদি সমাজে বাস্তবভাবে চর্চা হতো, তাহলে এমন শোষণমূলক শালিস ব্যবস্থা টিকে থাকত না। একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশাসনের নজরদারি ও আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি।
গ্রাম সমাজকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে হলে সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে স্বচ্ছ শালিস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যেন তারা ন্যায়ের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন। তা না হলে ন্যায়বিচারের নামে এই শোষণ আরও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে গ্রাম সমাজে।