আধুনিক সভ্যতার ঝলমলে আলো আর উন্নয়নের গল্পের আড়ালে আজও আমানবিক কষ্টে জীবন কাটে শিশু মারিয়ার। এ যেন অমানবিক বাস্তবতায়। উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগীর একটি প্রত্যন্ত এলাকায় পলিথিনে মোড়ানো ছাপড়া ঘরে মা আর নানিকে নিয়ে বসবাস করছে ৯ বছরের ছোট্র শিশু মারিয়া। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামই যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
কয়েক টুকরো পলিথিন আর বাঁশের কঞ্চিতে তৈরি এই ছাপড়া ঘরটিই যেন তার পুরো পৃথিবী। এখানেই ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখা। মারিয়ার সঙ্গে একই ছাপড়া ঘরে থাকেন তার ৭০ বছর বয়সী নানি ফাতেমা বেগম ও ৪৬ বছর বয়সী মা শারমিন। উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের একেবারে উন্নয়ন বঞ্চিত প্রত্যন্ত এলাকা পূব ছোপখালী গ্রামে এ পরিবারটির বসবাস।
ছাপড়া ঘরটিতে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যায়। সেই অন্ধকার দূর করার একমাত্র ভরসা একটি কেরোসিনের কুপি। কুপির টিপটিপে আলোতেই মারিয়া বই খুলে বসে। যেখানে খাওয়া হয়, সেখানেই ঘুম; আবার সেখানেই চলে তার পড়াশোনা। ছাপড়ার ভিতরে চৌকির মত তৈরী মাছায় উপরই তাদের জীবনের সব প্রয়োজন সারা হয়।
শীতের রাতে এই পরিবারটির দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কনকনে বাতাস পলিথিন ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়িয়ে কোনোমতে রাত পার করতে হয় তাদের। অনেক সময় শীতে ঘুম আসে না, রাত কাটে রিদারুন কষ্ট আর দুশ্চিন্তায়। বর্ষাকালে বৃষ্টি নামলেই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। ভিজে যায় কাপড়-চোপড়, কখনো মারিয়ার বই-খাতাও।
শারমিন একজন স্বামী-পরিত্যক্তা নারী। বিয়ে হয়েছে ২৫ বছর আগে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে সংসারর করেছেন অনেক বছর। ৮ বছর হলো সেই স্বামী তাদের রেখে আরেকটি বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সংসারের পুরো দায়িত্বই এখন তার কাঁধেই। জীবিকার তাগিদে অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাদেও সংসার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ফাতেমা বেগম এখন আর নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। সরকারের দেওয়া মাসিক ৩০ কেজি চালই এই পরিবারটির খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভরসা। বাজার থেকে মাছ, মাংস বা প্রয়োজনীয় সবজি কেনা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। নিজেদের লাগানো সামান্য শাকসবজি দিয়েই কোনোমতে দুবেলা খাবার জোটে।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও স্বপ্ন দেখে ছোট্ট মারিয়া। সে পাশের চর ঝোপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিকূলতার মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় সে। প্রতিদিন স্কুল শেষে ঘরে ফিরে কুপির আলোয় বই খুলে বসে। একদিন ভালো কিছু হওয়ার স্বপ্নই তাকে এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়। মায়ের কষ্ট ঘোচানো, নানিকে একটু স্বস্তির জীবন দেওয়া। চর ঝোপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম সরোয়ার জানান, মারিয়া পড়াশোনায় মনোযোগী হলেও তার পরিবেশই তার সবচেয়ে বড় বাধা। আমরা সকল ধরনের সহযোগিতা করে থাকি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এ পরিবারটির জন্য একটি নিরাপদ ঘরের ব্যবস্থা করা জরুরি। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা পেলে মারিয়া ও তার পরিবার পেতে পারে একটি নিরাপদ আশ্রয়। একটি ঘরই পারে তাদের অনিশ্চিত জীবনে কিছুটা স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা এনে দিতে।
মানুষ মানুষের জন্য এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেই সমাজের বিত্তবান ও দায়িত্বশীল মানুষের এগিয়ে আসা জরুরি। সামান্য সহযোগিতাই বদলে দিতে পারে তিন প্রজন্মের এই নারীদের জীবন। একটি ঘরই পারে মারিয়ার শৈশবকে কিছুটা নিরাপদ করতে, তার স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং অমানবিক বাস্তবতার ভেতরেও মানবিকতার একটি আলো জ্বালাতে। একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ঘর শুধু তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, এটি হতে পারে মানবিক মর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রথম সিঁড়ি।