সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
নান্দাইলে সুরাশ্রম দাখিল মাদ্রাসা নবগঠিত এডহক কমিটির সংর্ধ্বনা বেতাগীতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম অবহিতকরণ ও প্রেস কনফারেন্স আদমদীঘিতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা আদমদীঘিতে গর্ভকালীন সেবা কার্ড প্রদানে ২০০ করে ঘুষ নেয়ায় তোলপাড় তালতলীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস উপপরিচালকের আদমদীঘিতে বিএনপির কারা-নির্যাতিত ১৯ নেতাকর্মীকে সংবর্ধনা আমতলীতে ১৪৫ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নোটিশ না দেওয়ার অভিযোগ ব্যবসায়ীদের অসহায় মানুষের পাশে উত্তর তক্তাবুনিয়া আদর্শ যুব কল্যাণ সংস্থা, চিকিৎসা সহায়তা পেলেন দুই নারী মোরেলগঞ্জে বিএনপির উদ্যোগে মশা নিধন, বৃক্ষরোপণ ও বিক্ষোভ মিছিল বেতাগীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, ৫ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার

ধানের কাব্যের কবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
  • ৬৭০২ বার পঠিত
ফাইল ছবি

কার্তিক মাস শেষ হয়ে এলো প্রায়। অগ্রহায়ণ আসছে। আসছে নবান্নের দিন। বিশ্বজুড়েই হেমন্তকাল বা লেট অটাম কিংবা অটাম (শরৎ) হলো ফসল তোলার ঋতু। ধান উঠছে, ফসল উঠছে। এ মৌসুমকে বলা যায় হারভেস্ট টাইম। ফসল তোলার এই সময়টাতে প্রায় সব দেশেই রয়েছে নানা রকম লোকজ উৎসব। আমাদের দেশেও রয়েছে নবান্ন উদযাপনের সুপ্রাচীন রীতি। ফসল তোলার সময় মানুষ উৎসব করে কারণ শস্য বা ফসল মানুষকে জীবনদান করে, দান করে খাদ্য। মানুষের জীবন হরণ করার জন্য পাথরের মুষল থেকে শুরু করে তীরধনুক, তরোয়াল, বর্শা, কামান, বন্দুক, একে ফর্টিসেভেন, রাইফেল, মেশিনগান, এমনকি আণবিক বোমা অবধি রয়েছে।

বিশ্বের অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী ব্যস্ত রয়েছেন অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র তৈরির গবেষণায়। যে সময় এ লেখাটি পাঠক পড়ছেন হয়তো সে সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে আরও নতুন কোন অস্ত্র। মানুষকে আরও সুচারুভাবে, নিপুণভাবে যন্ত্রণা দিয়ে ব্যাপকসংখ্যায় কিভাবে হত্যা করা যায় সে নিয়ে কোটি কোটি ডলারের গবেষণা চলছে। রাসায়নিক অস্ত্র, জীবাণু অস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র সবকিছুই তৈরি হচ্ছে মানুষকে হত্যা করার জন্য। এসব অস্ত্রের আবিষ্কারক বিজ্ঞানীরাও বেশ নামীদামী। তারা নোবেল প্রাইজ পান, কোটি টাকা উপার্জন করেন। মানুষকে হত্যার জন্য আয়োজনকারীরা বিখ্যাত হলেও মানুষকে অনাহার থেকে বাঁচানোর জন্য যে মানুষটি সারা জীবন ব্যয় করেছেন, এখনও গবেষণা করে চলেছেন তার নাম আমরা ক’জনই বা জানি।

‘বিখ্যাত এই মানুষের জীবন যাপন খুবই সাদাসিধে। ১৯৬৪ সালে তিনি বিয়ে করেন তার সহযোগী তং চিকে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই তাদের জীবন ব্যয় করেছেন উচ্চ ফলনশীল ধানের গবেষণায়।’

ইউয়ান লং পিং এর নাম উচ্চারণ করলে আমাদের দেশের ক’জন মানুষই বা তাকে চিনবেন! অথচ এই মানুষটির জন্য বিশ্বে অসংখ্য মানুষ বেঁচে গেছে অনাহার থেকে। অসংখ্য কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা হয়েছে। সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে হুনান প্রদেশের ধান গবেষণা জাদুঘর দেখে পরিচয় পেলাম ধানের কাব্যের এই কবির। ইউয়ান লং পিং হলেন হাইব্রিড ধানের জনক। হুনান প্রদেশের রাজধানী ছাংশা বিশাল আধুনিক শহর। এখানে রয়েছে নতুন চীনের প্রতিষ্ঠাতা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মাও সে তুং এর স্মৃতিধন্য স্থাপনা। ছাংশা শহরে রয়েছে হাইব্রিড ধানের জনক ইউয়ান লং পিং এবং হাইব্রিড ধান বিষয়ক একটি জাদুঘর। বেশ বড় আকৃতির স্থাপনা।

ইউয়ান লং পিং এর জন্ম ১৯৩০ সালে বেইজিংয়ে। তবে তিনি হুনান প্রদেশে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তিনি একজন কৃষিবিদ। ১৯৫৩ সালে হুনানে কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু হয়। ষাটের দশকে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। অসংখ্য মানুষ এ সময় মৃত্যু বরণ করে। একটু ভাতের জন্য মানুষের হাহাকার দেখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন মানবদরদী লংপিং। তিনি ধানের ফলন বাড়ানোর সংগ্রামে নেমে পড়েন। তার কাছে মনে হয় বিশ্বে কোন মানুষ যেন অনাহারে মৃত্যুবরণ না করে। এটি নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন ফসলের ফলন এমনভাবে বাড়ানো যাতে বিশ্ব থেকে খাদ্যশস্যের অভাব দূর হয়।

কোন অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি নয় বরং ছোট্ট একটি কাঠের টেবিল, ছোট একটি ঘর, সাধারণ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম এই ছিল তার হাতিয়ার। মাঠে ঘাটে ঘুরে ধানের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে তিনি বের করেন উচ্চ ফলনশীল ধানের সঠিক জাত। দীর্ঘ কয়েক বছরের গবেষণার ফসল নষ্ট হয়ে যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে। তারপরও ভেঙে পড়েননি এই মানুষটি। নিরলস পরিশ্রম করেছেন। সত্তরের দশকে আবিষ্কৃত হয় হাইব্রিড ধান। ১৯৭৯ সাল নাগাদ বিশ্বের অনেক দেশে লংপিং উদ্ভাবিত ধান ফলতে শুরু করে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে তার উদ্ভাবিত ধানের চাষ শুরু হয়।

সারা চীনে ফসল উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যায়। বর্তমানে চীনের ৫০ শতাংশের বেশি ধান ক্ষেতে লংপিং এর হাইব্রিড ধান চাষ হচ্ছে। চীনের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশই লংপিং এর ‘সুপার রাইস’। ১৯৫০ এর দশকে চীনে যেখানে ৫৬৯ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হতো সেখানে এখন ১৯৪৭ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হচ্ছে। গত বিশ বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোগ্রাম ধান বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। ৬০ মিলিয়ন মানুষকে খাদ্য জোগানোর জন্য এই উৎপাদন যথেষ্ট।

২০১৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে লংপিং বলেন, বিশ্ব থেকে অনাহার দূর করতে হলে জেনিটিকালি মডিফাইড খাদ্য উৎপাদন ছাড়া উপায় নেই।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ইউয়ান লংপিংকে হাইব্রিড ধানের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। জীবদ্দশাতেই তিনি বিপুল সম্মান পেয়েছেন। পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সম্মাননা। তিনি ১৯৯১ সালে এফ এ ও( জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন)-এর প্রধান কনসালটেন্ট ছিলেন। তার কর্মযুদ্ধ নিয়ে স্থাপিত হয়েছে বিশেষ জাদুঘর। এটা কি কম প্রাপ্তি! গুণের সম্মান দেশবাসী তাকে দিয়েছে বলেই সে দেশে আরও গুণীর জন্ম হচ্ছে।

বিখ্যাত এই মানুষের জীবন যাপন খুবই সাদাসিধে। ১৯৬৪ সালে তিনি বিয়ে করেন তার সহযোগী তং চিকে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই তাদের জীবন ব্যয় করেছেন উচ্চ ফলনশীল ধানের গবেষণায়। এখনও প্রবীণ ইউয়ান লংপিং তার গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাষ হচ্ছে হাইব্রিড ধান। আমেরিকার কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক জরিপে দেখা যায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ ধানী জমিতে লংপিং এর সুপার রাইস চাষ হচ্ছে।

নবান্নের মৌসুমে ধানের কাব্যের এই কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে কিছু কথা লিখলাম। হয়তো পাঠকের তেমন ভালো লাগবে না। কারণ এতে রোমাঞ্চকর তেমন কিছুই নেই। কিন্তু এই ধরনের কর্মযোগী ও মানবদরদী মানুষের প্রতি যতো শ্রদ্ধাশীল হবো ততো আমরা মানবিকভাবে সমৃদ্ধ হবো।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..